ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চারদিক

বিবর্ণ নদী

বিবর্ণ নদী
×

আলম শাইন

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩৮

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ– এই পরিচয়ের মধ্যেই জড়িয়ে আছে আমাদের অর্থনীতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির দীর্ঘ পথচলা। আজ সেই নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু– একসময় জীবন আর বাণিজ্যের প্রাণ ছিল যে নদীগুলো, তাদের পানি এখন কালচে দুর্গন্ধযুক্ত। এমন অবস্থা যে, তাতে পায়ের পাতা ডোবানোর কথাও ভাবা যায় না। একসময় বুড়িগঙ্গার তীরে মানুষ বিকেলে বসে আড্ডা দিত; নদীর হাওয়া উপভোগ করত। এখন সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই দুর্গন্ধে অস্বস্তি লাগে। অবশ্য এ সংকট শুধু রাজধানীর আশপাশের নদীতেই সীমাবদ্ধ নয়। কর্ণফুলী, সুরমা, তিস্তা, ডাকাতিয়া, পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ দেশের ছোট-বড় প্রায় সব নদীই কোনো না কোনোভাবে দূষণের চাপ বহন করছে।

আমাদের দেশে শিল্পকারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার প্রবণতা এখনও ব্যাপক। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নগরের গৃহস্থালি বর্জ্য এবং পয়ঃনিষ্কাশনের বিশাল অংশ, যা কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে। কৃষিক্ষেত্র থেকেও নদীদূষণের ঘটনা ঘটছে। রাসায়নিক সার আর কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুয়ে আসা রাসায়নিক উপাদান নদী ও খালে গিয়ে মিশছে, যা মাছসহ জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। 

আমাদের অনেক নদী উজানের দেশ থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে; আর সেখানকার শিল্প-বর্জ্য কিংবা কৃষি-রাসায়নিকও নদীর পানিতে মিশে আমাদের সীমানায় ঢুকে পড়ছে। এই আন্তঃসীমান্ত দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা একা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এখানে প্রয়োজন আঞ্চলিক সহযোগিতা আর কূটনৈতিক উদ্যোগ।

নদীদূষণ রোধে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা বহুবার আলোচনায় এসেছে। বাস্তবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে। পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ওয়াসা, বিআইডব্লিউটিএ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করায় একটি সংস্থার উদ্যোগ প্রায়ই আরেকটির নিষ্ক্রিয়তায় ভেস্তে গেছে। শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এর বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে অনেক কারখানা বছরের পর বছর আইন অমান্য করেও কার্যত পার পেয়ে গেছে। অন্যদিকে জরিমানার পরিমাণ এতটাই কম যে, অনেক মালিকের কাছে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণের চেয়ে জরিমানা দেওয়াই বেশি সুবিধাজনক মনে হয়।
এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে শুধু প্রশাসনিক সমন্বয় ও আইন প্রয়োগ জোরদার করলেই হবে না; নদী দখলমুক্তির কাজে রাজনৈতিক সদিচ্ছা বেশি জরুরি। কারণ দখলদারদের একটি বড় অংশ প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যুক্ত। এ বাস্তবতা স্বীকার না করলে যে কোনো পরিকল্পনাই কাগজে-কলমে থেকে যাবে। 

শুধু ঢাকা নয়; দেশের প্রতিটি নদীর জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন, যেখানে নদীভিত্তিক অঞ্চল অনুযায়ী পরিকল্পনা তৈরি হবে। নদী কমিশনের ক্ষমতা বাড়িয়ে তাকে সত্যিকারের কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা দরকার, যাতে দখল- দূষণের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্ভব হয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ আর গণমাধ্যমকেও এই লড়াইয়ে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। কারণ শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগে এত বড় সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। 

নদীগুলো শুধু পানির উৎস নয়; দেশের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, বন্যার পানি ধারণ, মাটির উর্বরতা বজায় রাখা এবং অসংখ্য প্রজাতির জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলার লোকগান, পালাগান আর সাহিত্যের বড় একটি অংশ জুড়ে আছে নদীর কথা। নদী হারালে সেই ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে মুছে যাবে। তাই নদী রক্ষার প্রশ্নটি শুধু পরিবেশের নয়; রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রক্ষারও প্রশ্ন। 

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক

আরও পড়ুন

×