ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চারদিক

পশু-পাখির প্রতি আচরণ

পশু-পাখির প্রতি আচরণ
×

সামিয়া ইসলাম রোজা

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাণী নৈতিকতা আমাদের শেখায় যে প্রাণীরা কেবল কোনো বস্তুর মতো ব্যবহারযোগ্য বিষয় নয়, বরং তারা স্বতন্ত্র জীবন্ত সত্তা। মানুষের মতো জটিল চিন্তা বা ভাষার ক্ষমতা তাদের না থাকলেও তারা ব্যথা, ভয়, শান্তি, আনন্দ ও কষ্ট গভীরভাবে অনুভব করতে সক্ষম। তাদের অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সেই অনুভূতির তীব্রতা কোনো অংশেই কম নয়। প্রাণী সংগত কারণেই দুর্বল, অসহায় বা নিজের অধিকারের পক্ষে নিজে কথা বলতে অক্ষম। তাই বলে তাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় কষ্ট চাপিয়ে দেওয়া বা তাদের আমরা অবহেলা করতে পারি না, এটি নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রাণীদের এই কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা বলছে, তাদের প্রতি যত্নশীল, সহনশীল ও পরম সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা মানুষের মৌলিক দায়িত্ব।

বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে প্রাণীদের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহার করার ইতিহাস বহু পুরোনো। অনেক ক্ষেত্রে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি ও গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পেছনে প্রাণী গবেষণার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। এই গবেষণা ও আবিষ্কারের প্রক্রিয়াটি অনেক গভীর নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে। মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্য অন্য কোনো সংবেদনশীল সত্তাকে ভয়ানক শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মধ্যে ফেলে দেওয়া কতটুকু যুক্তিসংগত, সে প্রশ্ন আসছে। তাই গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত যে, প্রাণী নিয়ে কোনো পরীক্ষা সত্যিই অপরিহার্য কিনা, কিংবা এর বিকল্প কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব কিনা। যখন গবেষণার প্রয়োজনে প্রাণীর ব্যবহার এড়ানো একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখনও গবেষকদের দায়িত্ব থাকে তাদের অপ্রয়োজনীয় কষ্ট যথাসম্ভব কমিয়ে আনা এবং কঠোর মানবিক মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণ করা।

গবেষণার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো, বিনোদনের জন্য প্রাণীদের ব্যবহার। চিড়িয়াখানা, সার্কাস, বিভিন্ন প্রাণীর খেলা বা অন্যান্য প্রাণি সম্পর্কিত বিনোদনমূলক কার্যক্রমে প্রায়ই প্রাণীদের তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন করে বন্দিদশায় রাখা হয়। এসব স্থানে প্রাণীদের শারীরিক ও মানসিক কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। মানুষকে আনন্দ দিতে গিয়ে প্রাণীদের এমন কোনো কৃত্রিম বা শারীরিক পরিস্থিতির মুখে বাধ্য করা উচিত নয়, যা তাদের মধ্যে তীব্র ভয়, শারীরিক কষ্ট বা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। বিনোদন যেন কোনোভাবেই শোষণের রূপ না নেয়। বরং প্রাণীদের নিজস্ব স্বাভাবিক জীবনযাত্রার উপযোগী, মানানসই ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।

প্রাণী নৈতিকতা শুধু প্রাণীদের সুরক্ষা প্রদান বা তাদের বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি মানুষের নিজস্ব নৈতিক মানদণ্ড, সভ্যতা ও মূল্যবোধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আমরা প্রাণীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করি, তা আমাদের সমাজের সংবেদনশীলতার পরিচয় বহন করে। এটি আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবীর অন্যান্য সৃষ্টির প্রতি মানুষের একটি স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। প্রাণীদের অপ্রয়োজনীয় কষ্ট কমানো এবং তাদের ভয়হীন পরিবেশে ভালোবাসা ও যত্নের সঙ্গে বাঁচতে দেওয়া আমাদের অস্তিত্বের মৌলিক দায়িত্ব।
আদর্শ সমাজব্যবস্থায় প্রাণীদের ব্যবহার বা তাদের কল্যাণসংক্রান্ত বিষয়ে সবার মতামত পুরোপুরি এক নাও হতে পারে। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা বা অবিচার যে ভুল এবং তা যে বর্জনীয়– এই মৌলিক সত্যটি আমাদের সবাইকে মেনে নিতেই হবে। প্রাণীদের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা, সহানুভূতি, যত্ন ও সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই আমরা একটি আরও মানবিক, দায়িত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে সৃষ্টির প্রতিটি সংবেদনশীল রূপ তার যোগ্য সম্মান পাবে।

সামিয়া ইসলাম রোজা: শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ-ইউল্যাব

আরও পড়ুন

×