উন্নয়ন
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুর্ভোগ এবং উন্নত বিশ্বের শিক্ষা
শামসুন নাহার
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রতি আমার ছেলেকে নিয়ে ঢাকা থেকে সিলেটে সড়কপথে যাওয়ার সময় আবারও এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ও হতাশাজনক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। প্রায় চার বছর আগে একই পথে যাতায়াত করতে গিয়ে যে দুর্ভোগ দেখেছিলাম, এত বছর পর তার অনেকটাই যেন একই রকম রয়ে গেছে। কোথাও রাস্তা খোঁড়া, কোথাও অসমাপ্ত নির্মাণকাজ, কোথাও ধুলাবালি, কোথাও দীর্ঘ যানজট। আর এসবের মাঝখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের মূল্যবান সময়ের অপচয়। দীর্ঘ যাত্রাপথে একটি প্রশ্ন বারবার মনে এসেছে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এক মহাসড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করতে আমাদের কত বছর প্রয়োজন?
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক কোনো সাধারণ সড়ক নয়। রাজধানীর সঙ্গে বৃহত্তর সিলেটের যোগাযোগ, পর্যটন, শিল্প, প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য এই মহাসড়কের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রায় ২১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এই দীর্ঘ যাত্রার সময় আমার মনে পড়ছিল এজরা ক্লেইন ও ডেরেক থম্পসনের আলোচিত গ্রন্থ ‘অ্যাবানডান্স’-এর কথা। বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, রাষ্ট্র কত অর্থ বরাদ্দ দিতে পারে কিংবা কত বড় প্রকল্প ঘোষণা করতে পারে, শুধু তা দিয়ে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বিচার করা যায় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতার পরীক্ষা হলো, সেই অর্থ ও পরিকল্পনাকে কত দ্রুত, দক্ষতার সঙ্গে এবং যৌক্তিক ব্যয়ে মানুষের বাস্তব কল্যাণে রূপান্তর করা যায়। অর্থ ব্যয় করার সক্ষমতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা।
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রশাসনের ক্ষেত্রে এই দর্শন প্রাসঙ্গিক। আমাদের প্রকল্পের অভাব নেই, পরিকল্পনারও অভাব নেই। হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক আছেন, প্রকৌশলী আছেন, পরামর্শক আছেন, ঠিকাদার আছেন, মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা আছে। সভা হচ্ছে, কমিটি হচ্ছে, পরিদর্শন হচ্ছে, প্রতিবেদনও তৈরি হচ্ছে। এত কিছুর পরও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বছরের পর বছর অসমাপ্ত থাকে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা-সংক্রান্ত জটিলতা, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং অন্যান্য বাস্তবায়ন সমস্যার কথা বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এসব কারণকে শুধু ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং প্রশ্ন করা প্রয়োজন– এসব সমস্যা প্রকল্প গ্রহণের আগেই যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল কিনা।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে। উন্নত দেশেও বড় প্রকল্প বিলম্বিত হয়, ব্যয় বাড়ে এবং কখনও পরিকল্পনাগত ভুল হয়। কোনো দেশই এসব সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, সেখানে বড় অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা, পরিবেশগত প্রভাব, প্রকৌশলগত বাস্তবতা, ভূমির প্রয়োজন, নিরাপত্তা, সম্ভাব্য ব্যয় এবং বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে নির্মাণ শুরু হওয়ার আগেই যতটা সম্ভব বড় বাধাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। সেখানে কোনো প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে কিংবা সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে গেলে তার কারণ ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনার সুযোগ থাকে। অর্থাৎ প্রকল্পের সাফল্য শুধু কত টাকা ব্যয় হলো, তা দিয়ে নয়; নির্ধারিত অর্থ, সময় ও মানের মধ্যে কী ফলাফল পাওয়া গেল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই প্রথম বড় শিক্ষা– প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করার আগের প্রস্তুতি। ভূমি অধিগ্রহণ অসম্পূর্ণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর হয়নি, নকশা চূড়ান্ত হয়নি– এমন অবস্থায় বড় প্রকল্পের কাজ শুরু করলে পরবর্তী দীর্ঘসূত্রতা অনেকটাই অনুমেয়। প্রকল্প কাগজে শুরু হলো, কিন্তু ঠিকাদারকে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গাই বুঝিয়ে দেওয়া গেল না, এ ধরনের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ উন্নত অবকাঠামোর দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা শুধু সুন্দর সড়ক, সেতু কিংবা রেলব্যবস্থা দেখি। এসব দৃশ্যমান অবকাঠামোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রকৌশল দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির একটি সংস্কৃতি। আমাদের শুধু তাদের অবকাঠামো দেখে মুগ্ধ হলে হবে না। যে প্রশাসনিক সক্ষমতা সেই অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, সেটিও বুঝতে হবে।
উন্নত বিশ্বের কাছ থেকে আমাদের আরেকটি মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন– সরকারি অর্থ আসলে জনগণের অর্থ। একটি প্রকল্পের ব্যয় যদি হাজার কোটি টাকা বেড়ে যায়, সেটি কোনো বিমূর্ত সরকারি অর্থের বৃদ্ধি নয়। সেই অর্থ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনগণকেই বহন করতে হয়। তাই প্রকল্পের ব্যয় বাড়লে কেন বাড়ল; সময় বাড়লে কেন বাড়ল– এই প্রশ্ন করার অধিকার জনগণের রয়েছে।
শামসুন নাহার: শিক্ষক, ল্যামফিয়ার পাবলিক স্কুলস, মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র
- বিষয় :
- উন্নয়ন