চারদিক
ভাঙাড়ি ব্যবসা কিংবা শিল্প
মো. হারুনার রশিদ
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমরা প্রতিদিন যে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, ওয়ানটাইম ব্যবহার্য সামগ্রী ব্যবহার করে ফেলে দিই, সেগুলো আমাদের কাছে নিছক বর্জ্য। অথচ এসবের একটি বড় অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য। এই পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ভাঙাড়ি শিল্প।
ভাঙাড়ি ব্যবসাকে আমরা অনেক সময় অবহেলার চোখে দেখি। শহর-নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এই শিল্পের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী ও বর্জ্য সংগ্রহকারীরা প্রতিদিন আমাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট, বাজার ও রাস্তার পাশ থেকে বিপুল পরিমাণ পরিত্যক্ত সামগ্রী সংগ্রহ করেন। তারা এসব বর্জ্য বাছাই করে পুনর্ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন কারখানায় সরবরাহ করেন। ফলে একটি পরিত্যক্ত বস্তু আবার শিল্পের কাঁচামালে পরিণত হয়।
ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী ও বর্জ্য সংগ্রহকারীরা যদি আমাদের চারপাশ থেকে এসব বর্জ্য সংগ্রহ করা বন্ধ করে দেন, তাহলে প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, পলিথিন, কাগজ, বোতল, লোহা ও অন্যান্য বর্জ্য রাস্তা, নালা, ড্রেন ও খোলা জায়গায় জমতে থাকবে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এর ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
বিশেষ করে প্লাস্টিক ও পলিথিন আমাদের জন্য বড় হুমকি। যত্রতত্র ফেলে দেওয়া এসব বর্জ্য ড্রেন ও নালায় গিয়ে জমে পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। রাস্তাঘাট ডুবে যায়, যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং জনদুর্ভোগ বাড়ে। ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীরা নিয়মিত এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে নেওয়ায় সমস্যার একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ভাঙাড়ি শিল্প শুধু পরিবেশ রক্ষা করছে না; এটি কর্মসংস্থানেরও একটি বড় ক্ষেত্র। বর্জ্য সংগ্রহকারী, ভাঙাড়ি দোকানি, পাইকার, পরিবহন শ্রমিক এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। পুরোনো লোহা, প্লাস্টিক, কাগজ ও কাচ পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে নতুন কাঁচামালের ওপর চাপ কমছে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয়ও হ্রাস পাচ্ছে।
তাই ভাঙাড়ি শিল্পকে নিছক পুরোনো জিনিস কেনাবেচার ব্যবসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ রিসাইক্লিং শিল্প। পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তুলতে এ শিল্পকে আরও সংগঠিত ও আধুনিক করা প্রয়োজন। ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীদের তালিকাভুক্ত করে নির্দিষ্ট কর্মস্থল, বর্জ্য সংরক্ষণের জায়গা, প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক ও পলিথিন না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করে রাখতে হবে। এতে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীরা সহজে এসব সামগ্রী সংগ্রহ করতে পারবেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, যে জিনিসকে আমরা আবর্জনা মনে করে ফেলে দিই, ভাঙাড়ি শিল্প সেটিকেই সম্পদে পরিণত করে। নগরজীবনকে পরিচ্ছন্ন, সচল ও পরিবেশবান্ধব রাখতে তাই ভাঙাড়ি শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। এই নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে অবহেলা নয়; যথাযথ স্বীকৃতি ও সহযোগিতা দিয়ে আরও শক্তিশালী করাই সময়ের দাবি। ভাঙাড়ি বা পরিত্যক্ত বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ (রিসাইক্লিং) শিল্প পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখলেও এটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। সঠিক নীতিসহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া পেলে এই খাত দেশের ভারী শিল্প ও কর্মসংস্থানে আরও বড় অবদান রাখতে পারে। ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীদের জন্য কম সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা। আধুনিক রিসাইক্লিং মেশিন ব্যবহারে শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ব্যবসাকে বৈধ ও সুশৃঙ্খল করতে সহজ লাইসেন্সিং নীতি তৈরি করা হতে পারে প্রাথমিক পদক্ষেপ।
মো. হারুনার রশিদ: সিনিয়র শিক্ষক, আলহাজ্ব এম. এ. আজিজ হাই স্কুল, ফরিদপুর
[email protected]
- বিষয় :
- চারদিক