আন্তর্জাতিক
কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক জেসন আরডে প্রাতিষ্ঠানিক হত্যার শিকার
স্নেহা কৃষ্ণন
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
১৪ আগস্ট কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হওয়া সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ পণ্ডিত জেসন আরডেকে লন্ডনে তাঁর নিজ বাসভবনে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। এর ঠিক এক সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে, প্লেজিয়ারিজম বা চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত এক সপ্তাহের চরম বিদ্বেষপূর্ণ অভিযানের পর তিনি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম, ইন্টারনেটের মিম সৃষ্টিকারী মহল এবং বিভিন্ন বিশ্লেষক ৪১ বছর বয়সী এই কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি দিক ব্যবচ্ছেদ করেছেন– তাঁর কথা বলার ধরন থেকে শুরু করে তাঁর গবেষণা পর্যন্ত। পরম আনন্দে তারা দাবি করেছেন যে, তারা নাকি তাঁর তথাকথিত ‘মিথ্যা’ ও ‘চৌর্যবৃত্তি’ ফাঁস করে দিয়েছেন এবং তাঁকে নির্মমভাবে অপদস্থ করেছেন। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অনেকেই ‘সত্য’ উন্মোচনের দোহাই দিয়ে তাদের এই আচরণকে সমর্থনও করেছেন।
প্রথম থেকেই এটি একেবারে স্পষ্ট ছিল, ‘চৌর্যবৃত্তি’র এই তথাকথিত উন্মোচনটি মূলত একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল এটি প্রমাণ করা যে, সমতা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইডিআই) উদ্যোগগুলো তাত্ত্বিকভাবে অসৎ উদ্দেশ্য দ্বারা তাড়িত।
এই আক্রমণগুলো কেবল ডানপন্থিদের কাছ থেকেই আসেনি– যেখানে দ্য স্পেক্টেটর ও দ্য টেলিগ্রাফের মতো পত্রিকাগুলো একের পর এক আরডেকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে– বরং বামপন্থিদের কাছ থেকেও এসেছে। যেমন বামপন্থি আউটলেট নোভারা মিডিয়ার সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যারন ব্যাস্তানি এক্স পোস্টে লেখেন, ইউটিউবে থাকা ৪০ মিনিটের একটি বক্তৃতায় আরডে নাকি ‘কিছুই বলেননি’। এরপর তিনি তাঁকে একজন ‘প্রতারক’ বলে অভিহিত করেন।
আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, এই সবকিছু নাকি করা হচ্ছে শিক্ষায় নীতি-নৈতিকতা বজায় রাখার স্বার্থে। কিন্তু হঠাৎ কেন কেবল একজন কৃষ্ণাঙ্গ পণ্ডিতকে চিহ্নিত করে এভাবে ‘উন্মোচন’ করার এতটা আগ্রহ দেখা গেল, তা এখনও তলিয়ে দেখা হয়নি। এর বদলে সবাই ইডিআই-বিরোধী জোয়ারে গা ভাসিয়েছে– বামপন্থিরা এসে ভিড়েছে ‘পরিচয়ের রাজনীতি খারাপ’ এই যুক্তিতে, আর ডানপন্থিরা খোলামেলা বর্ণবাদ আঁকড়ে ধরেছেই।
কিন্তু আরডে কি সত্যিই তাঁর থিসিস বা অন্য কোনো লেখায় চুরি করেছিলেন? একটি তদন্তে দেখা গেছে, তিনি তা করেননি এবং আরেকটি তদন্ত তখনও চলছিল। সামাজিক মাধ্যমে মানুষ যেভাবে নিশ্চিত হয়ে মতামত তৈরি করেছিল, তার মূল ভিত্তি ছিল বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন অনুচ্ছেদের সংক্ষিপ্ত ভিডিও ও ছবি, যেখানে অন্য গবেষকদের লেখার সঙ্গে তাঁর লেখার তুলনা করা হচ্ছিল।
এ ছাড়া আরডের অটিজম এবং তাঁর অ্যাথলেটিক্সের অর্জন নিয়ে ক্রমাগত গুঞ্জন ও ট্রোল করা হয়েছে। এগুলো হাসাহাসির বিষয় বানিয়ে যে আনন্দ নেওয়া হয়েছে, তা একদিকে যেমন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার অস্বীকার করার শামিল, অন্যদিকে চরম তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তৈরি করা প্রতিবেদন। যেমন– আরডে বক্তৃতা দিতে দেরি করেছিলেন কিংবা বর্ণবাদের দাবির সপক্ষে এক শিক্ষার্থীর মতে পর্যাপ্ত তথ্যসূত্র দিতে পারেননি।
আরডের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে যে ধরনের সাংবাদিকতা হয়েছে, তা আমার কাছে ভীষণ পরিচিত মনে হয়। আমি ভারতের মানুষ; সেখানে কয়েক দশক ধরে উচ্চবর্ণের অভিজাতরা দাবি করে আসছে যে, শিক্ষাঙ্গনে ‘যোগ্যতা’ বজায় রাখতে হলে পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্ণের গবেষকদের জন্য থাকা সংরক্ষণ বা কোটা নীতি বন্ধ করতে হবে। হার্ভার্ডের গবেষক অজন্তা সুব্রহ্মণ্যমের কাজ যেমনটা দেখায়, দক্ষিণ এশিয়ায় ‘যোগ্যতা’ হলো মূলত জাতপ্রথারই একটি ধর্মনিরপেক্ষ রূপ। এটি দৃশ্যত বস্তুনিষ্ঠ পরিমাপক, যা বর্জন ও অমানবিকীকরণের একটি সহিংস ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। আরডের ওপর ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমের এই সহিংস আক্রমণের পেছনেও ঠিক এই একই নীতি কাজ করেছে।
এই প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে দলিত গবেষকরা যে কাঠামো ব্যবহার করে এই ধরনের মৃত্যুকে বর্ণনা করেছেন, তা বিবেচনা করা দরকার। আর তা হলো ‘প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা’। ২০১৬ সালে হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ নির্যাতনের পর দলিত পিএইচডি শিক্ষার্থী রোহিত ভেমুলা আত্মহত্যা করার পর এই শব্দটি ব্যাপক পরিচিতি পায়। ‘প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা’ ধারণাটি গভীর বর্ণবাদী বা বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার ফলে হওয়া মৃত্যুকে একটি পদ্ধতির ভেতর থেকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ দেয়, যা মূলত বেঁচে থাকার পরিবেশকে সংকুচিত করে তোলে। আরডেকে ক্রমাগত হেনস্তা করা এবং তাঁর এই মৃত্যু কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি কৃষ্ণাঙ্গবিরোধী বর্ণবিদ্বেষী ব্যবস্থার দ্বারা সংঘটিত একটি সুনির্দিষ্ট ‘প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা’।
স্নেহা কৃষ্ণন: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান জিওগ্রাফির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর; আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক