জনস্বাস্থ্য
হামের চিকিৎসায় পরিবারের নিঃস্বতা বনাম রাষ্ট্রের উদাসীনতা
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
সন্তান অসুস্থ হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর ধকল মা-বাবার ওপর দিয়ে যায়। শারীরিক ও মানসিক চাপ তো আছেই, অর্থনৈতিক চিন্তাও তাদের গ্রাস করে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারলে খরচ কিছুটা কম হয়; বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চ ব্যয় বিষয়ে বলাই বাহুল্য। তবে নিম্নবিত্তের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয় মাত্রই বড় চাপ। হামে আক্রান্ত শিশুদের পরিবারের ওপর সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, হামের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ৮৯ শতাংশ পরিবারই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে; সঞ্চয় শেষ হয়েছে ৬১ শতাংশ পরিবারের। আর গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন বলছে, শিশুর হামে চিকিৎসা করাতে ঘরবাড়ি বিক্রি করে পরিবার নিঃস্ব। এ বছর হামে যারা মারা গেছে তাদের বিপুল অধিকাংশই নিম্নআয়ের পরিবারভুক্ত। মঙ্গলবার পর্যন্ত চলতি বছর দেশে হাম ও এর উপসর্গে ৯১৮টি শিশুর প্রাণহানি হয়েছে।
এটিকে স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রের অবহেলার প্রতিফলনও বলা যায়। যে কোনো চিকিৎসায় একই চিত্র দেখা যায়। সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে এত নিষ্পাপ শিশুর মায়ের বুক খালি হলেও সরকার নির্বিকার। রাজনীতিক, নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী; কারোরই যেন মাথাব্যথা নেই। সংবাদমাধ্যম প্রতিদিনই খবর দিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এমন অবহেলাপূর্ণ মৃত্যু কেবল পরিবারেরই শূন্যতা? আদরের সন্তানের চিকিৎসা করাতে যেভাবে পরিবারকে ঘরবাড়ি বিক্রি করে নিঃস্ব হতে হয়, তাতে মনে হয়, অভিভাকেরই সব দায়। মা-বাবা তো আর নাড়িছেঁড়া ধন ফেলতে পারেন না!
বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আমাদের শিশুদের কোনো রোগেই নিস্তার নেই। এবার হাম; এর আগে ছিল ডেঙ্গু। কয়েক বছর ধরেই ডেঙ্গুতে শিশুরা মারা যাচ্ছে। এটি প্রতিরোধে নানামুখী তৎপরতার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে সেগুলো কাজে আসছে না। মঙ্গলবারের খবর অনুযায়ী, এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৫৩ জন; মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। ডেঙ্গু আক্রান্ত অভিভাবককেও চিকিৎসা ব্যয়ে একই সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
প্রাসঙ্গিকভাবেই অভিজ্ঞতা চলে আসে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আমার আত্মজা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রথমে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়। সেখান থেকে বেসরকারি হাসপাতালে এক সপ্তাহ আইসিইউসহ মোট ১০ দিন থাকতে হয়। ধারকর্জে তখন হাসপাতালের দায় মেটালেও প্রায় এক বছর পরও সেই দেনা মেটাতে পারিনি। সন্তানের চিকিৎসায় অভিভাবক কতটা অসহায়, তখনই টের পেয়েছি।
মঙ্গলবারের সমকালের প্রতিবেদনে হামে আক্রান্ত কয়েকটি শিশুর পরিবারের অর্থনৈতিক দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি আট মাসের ইনাইয়া। জ্বর থেকে শুরু করে হাম, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুকে বাঁচাতে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছে তার পরিবার। প্রায় দুই মাস ধরে একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসায় ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে জমিজমা ও সংসারের জিনিসপত্র বিক্রি করতে হয়েছে তাদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসেছে মরিয়ম। হামের চিকিৎসায় তার মা ইতোমধ্যে নিজের গহনা বিক্রি করেছেন।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত হামের চিকিৎসা-সংক্রান্ত বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের গবেষণায় উঠে এসেছে, হামে আক্রান্ত পরিবারের ৮৯ শতাংশকেই ঋণ নিতে হয়েছে। এমনকি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা হলেও অভিভাবকদের ঋণ করতে হয়েছে। কারণ, সেখানে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত, খাবার ও হাসপাতালে অবস্থানের আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে হয়েছে। এসব ব্যয় বহন করতে গিয়েই প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টিকেই ধারদেনা করতে হয়েছে।
সন্তানের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে নাগরিক নিঃস্ব হলে রাষ্ট্রের কী বা আসে যায়। যদিও নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, স্বাস্থ্য কোনো সুবিধা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দলটি প্রত্যেক নাগরিককে মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করার কথা বললেও ছয় মাসে এর কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি। মে মাসে দেশের ছয় জেলায় পড়ে থাকা ছয়টি শিশু হাসপাতাল চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সে কাজ কতটা শুরু হয়েছে, আমরা জানি না। তবে এটা জানি, ওষুধের দামের দিক থেকে সরকার উল্টো পথে হেঁটেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ওষুধের দাম নির্ধারণে যে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা’ এবং নতুন ‘মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি’ তৈরি করেছিল, সম্প্রতি সরকার তা বাতিল করেছে। এতে ওষুধ কোম্পানি ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে দিলেও করার কিছুই থাকবে না, তাতে নাগরিকের চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে।
মানুষ রোগে আক্রান্ত হলে শুরুতেই সরকারি হাসপাতালে যায়। সেখানকার অব্যবস্থাপনা দূর করা জরুরি। হাসপাতালে এসেই একজন নাগরিক যেন সেখানকার চিকিৎসক ও স্টাফদের থেকে ভালো আচরণ ও সঠিক নির্দেশনা পায়। পাশাপাশি চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে লেখা ওষুধ বিনামূল্যে সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ভর্তি করানো লাগলে নিয়ম মেনে হাসপাতালে ভর্তি এবং তৎপরবর্তী চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। হাম কিংবা ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক রোগে এটা সবচেয়ে জরুরি। অভিভাবকের ব্যয় সবচাইতে বেড়ে যায় যখন আইসিইউর মতো চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। বেসরকারি হাসপাতালে এই সেবা থাকলেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সরকারি হাসপাতালগুলোতে তাই পর্যাপ্ত আইসিইউ থাকতে হবে। তাছাড়া অপারেশনসহ ব্যয়বহুল সকল চিকিৎসার পর্যাপ্ত বন্দোবস্ত সরকারি হাসপাতালে থাকা জরুরি।
সন্তানের অসুস্থতা মানে দিনশেষে পরিবারেরই বেদনা। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীকে, ক্ষেত্রবিশেষে সহায়ক হিসেবে পাওয়া গেলেও শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সব ধকলই অভিভাবকের ওপর দিয়ে যায়।
তাই রাষ্ট্র আর্থিক দিক নিশ্চিত করলেও পরিবার কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে।
হামে আক্রান্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিন। এভাবে শিশুরা মরতে পারে না। সরকার বাহাদুর, নিঃস্ব পরিবারগুলোর সহায় হোন।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]