চারদিক
নারী বাস সার্ভিসের নবম যাত্রা!
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
এই সপ্তাহে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি সড়কে ১৪টি বাস নারীদের জন্য পৃথক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে পিংক বাস সার্ভিস। দেশের শহরগুলোতে উন্নত বিশ্বের তুলনায় বসবাসকারীর সংখ্যা কয়েক গুণ। অন্যদিকে গণপরিবহন ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। বিশেষত বিপুলসংখ্যক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষত কর্মজীবী নারীরা এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করে। গণপরিবহনে তাদের জন্য কিছু আসন সংরক্ষিত রাখা হলেও ব্যবস্থাটি প্রথমত অপ্রতুল, দ্বিতীয়ত প্রায় অকার্যকর। এ প্রেক্ষাপটে পিংক সার্ভিসের মতো প্রকল্প চাকরিজীবী নারীদের জন্য একটা আশীর্বাদ হতে পারে।
কিন্তু ১৩টি রুটে বাস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৪টি! সিন্ধু পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় তা যে বিন্দুবৎ, বলাই বাহুল্য। উপরন্তু বুধবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনমতে, অতীতে এই উদ্যোগ আটবার চালু হলেও বহাল থাকেনি। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলক নারীদের জন্য এই সেবা চালু করে, যা সরকার বহাল রাখতে ব্যর্থ হয়। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার এসে একই উদ্যোগ চালু করে। তারাও এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার নজির রেখেছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ৬ বার প্রকল্পটি চালু করলেও তা আর চলমান থাকেনি। এতে স্পষ্ট– সরকারগুলো যথেষ্ট পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়নি। তা ছাড়া প্রকল্পের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করার যে অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠছে, সেটিও পরিষ্কার।
জাতিসংঘ বলছে, ২০৫০ সালে ঢাকা জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় শহরে পরিণত হতে পারে। আগামী ২৫ বছর জনসংখ্যা ৫ শতাংশ হারে বাড়বে। ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স (ইকোসক) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর বা মেগাসিটি ঢাকা, যেখানে ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বাস করে। গড়ে এক বর্গকিলোমিটার জায়গায় ২৩ হাজার ৯৫৩ জন বাস করে। জনসংখ্যার দিক থেকে ক্রমবর্ধমান এবং নারী-পুরুষের অবাধ লেনদেনমূলক সমাজে লিঙ্গভিত্তিক কার্যকরী সেবা দিতে গেলে সংখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ। পিংক সার্ভিস প্রকল্পে প্রতিবারই বাসের সংখ্যার দিকটি উপেক্ষিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রকল্পটি ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের এ পর্যন্ত গৃহীত প্রকল্পগুলোতে সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন দক্ষতার অভাব, যেখানে কোনো সরকারই গুরুত্ব
দিচ্ছে না।
এই পরিপ্রেক্ষিতে একটা উদাহরণ প্রাসঙ্গিক। অতিবৃষ্টিতে চট্টগ্রাম শহর ডুবে যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু যুগ যুগ ধরে এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না; কেবল মৌসুমভিত্তিক কিছু সংস্কারমূলক প্রকল্প ছাড়া। অথচ এই সমস্যারও স্থায়ী সমাধান রয়েছে, যা সরকারগুলো করছে না।
পিংক সার্ভিস প্রকল্পের ক্ষেত্রেও যেন একই কথা বলতে না হয়। ইতোমধ্যে সরকারের ৮ বারের অভিজ্ঞতা থাকার পরও সরকার কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে? এখন কি লোক দেখানো কিছু করার সময়? আরেকটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যাপক ঘাটতি চলাকালে পিংক সার্ভিসের মতো প্রকল্প কেন? তবে তারা যদি আধাখেঁচড়া কিছু না করে কার্যকর কিছু করত, তাতে এ প্রশ্ন উঠত না।
সরকার ক্ষমতায় আসার পর খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। প্রশ্ন হলো, এগুলো কি বিদ্যমান মৌলিক সমস্যাগুলোর কোনোটাই নিরসন করবে? এগুলো যতটা প্রদর্শনমূলক, ততটা কার্যকর নয়। কার্যকর তখনই হবে যখন সরকার রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রভাবে দখলকৃত খালগুলো উদ্ধার করবে; কৃষিসহ নিত্যপণ্যের দাম জনসাধারণের নাগালে আনবে এবং সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে দেবে। আশা করি, সরকার পিংক বাস সার্ভিসে বাসের সংখ্যা বাড়িয়ে প্রকল্পটির স্থায়িত্ব দেবে।
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- চারদিক