আন্তর্জাতিক
ট্রাম্পের ইচ্ছা পূরণের পরও সিউল কেন অস্বস্তিতে
রাফায়েল রশিদ
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত বছরের আগস্টে তাদের প্রথম শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ুং ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট, আপনি যদি শান্তির রূপকার হন, তবে আমি আপনার সহযোগী হিসেবে পাশে থাকব।’
ওভাল অফিসে করা এই মন্তব্যটি উত্তর কোরিয়ার প্রতি লির সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল সুরটি ধরে ফেলেছিল। সেটি হলো, সামরিক শক্তি প্রদর্শন কমিয়ে আনা এবং সংলাপ পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বারবার শান্তির বার্তা দেওয়া। যদিও সিউলের নিরস্ত্রীকরণের দাবির কারণে পিয়ংইয়ং বারবারই সেসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে। সময় গড়িয়ে আজ এই সপ্তাহে এসে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমিয়ে আনার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঠিক সেই বিষয়ের সঙ্গেই মিলে যায়। সেটি হলো পিয়ংইয়ংকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য উপায় হিসেবে বিভিন্ন সময়ে লি নিজে থেকেই তুলে ধরেছিলেন।
লির মূল বার্তাটি হলো, দক্ষিণ কোরিয়ার উচিত নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি করে নিজেদের কাঁধে নেওয়া এবং অন্যের ওপর নির্ভরতা কমানো। গত মঙ্গলবার তিনি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সামরিক বাহিনীর যুদ্ধকালীন অপারেশনাল কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণ নিজ দেশের হাতে ফিরিয়ে নেওয়া এবং পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন কর্মসূচিতে অগ্রগতি সাধনের দাবি জোরালো করেন।
ট্রাম্প অবশ্য মহড়া কমানোর কাজটি করেছেন তাঁর স্বভাবসুলভ অদূরদর্শিতা ও অভদ্র কায়দায়। যেমন মহড়া শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে, তা সত্ত্বেও এই পদক্ষেপ দক্ষিণ কোরিয়ার প্রচলিত রাজনৈতিক মেরূকরণকে উল্টে দিয়েছে। দেশটিতে অর্থনৈতিক বা সামাজিক মূল্যবোধের চেয়ে উত্তর কোরিয়ার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি অর্থাৎ কট্টরপন্থি বনাম নমনীয়পন্থি কিংবা সংঘাত বনাম সংলাপ– এর ওপর ভিত্তি করেই মূলত বাম ও ডানপন্থি বিভাজন নির্ধারিত হয়ে থাকে।
যৌথ মহড়া কমানোর বিষয়টি কোরিয়ান বামপন্থিদের দীর্ঘদিনের দাবি। সেই নীতি যখন একজন দক্ষিণপন্থি মার্কিন প্রেসিডেন্ট এসে তাঁর মধ্য-বামপন্থি দক্ষিণ কোরিয়ান প্রার্থীর ওপর চাপিয়ে দেন, তখন উভয় পক্ষের জন্যই বিষয়টি বেশ অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়।
যদিও কেউ কেউ এই মহড়া কমিয়ে আনাকে কূটনীতির জন্য সম্ভাব্য উপযোগী বলে মনে করছেন, তবে সিউলে বড় যে উদ্বেগটি কাজ করছে তা হলো ট্রাম্প নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভকে দুর্বল করে দিচ্ছেন। আর তিনি সরাসরি নিজেদের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়ার কথা বলার সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছেন। এটি এমন একটি মৈত্রী সম্পর্ক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, যা কোরিয়ান যুদ্ধের পর থেকে এই উপদ্বীপের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।
বিরোধী রক্ষণশীল পিপল পাওয়ার পার্টি এই সিদ্ধান্তকে একটি ‘নিরাপত্তা দুর্যোগ’ বলে অভিহিত করেছে এবং ‘কোরিয়া পাসিং’ নীতি ফিরে আসার ব্যাপারে সতর্ক করেছে; যেখানে সিউলকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রক্ষণশীল সংবাদপত্রগুলো এই সিদ্ধান্তকে প্রায় একবাক্যে বেপরোয়া বলে আখ্যায়িত করেছে। প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘ছোসুন ইলবো’ আরও এক ধাপ এগিয়ে এর জন্য সরাসরি লির সরকারকে দায়ী করেছে।
বামপন্থিরা অবশ্য এই মাত্রায় শঙ্কিত নয়। দেশটির অন্যতম প্রধান বামঘেঁষা পত্রিকা ‘হাংকিওরে’ ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের মূল বিষয়ের বিরোধিতা না করে কেবল এর ঘোষণা পদ্ধতির সমালোচনা করেছে, যেটি অত্যন্ত অবিবেচকের মতো একতরফাভাবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। পত্রিকা এটিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছে। অন্যদিকে ‘কিউংহায়াং শিনমুন’ অপেক্ষাকৃত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে বলেছে, প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় থাকা সাপেক্ষে এই কমিয়ে আনাকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করতে পারে।
সিউলের সোয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক জেচুন কিমের মতে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরে এই ঘটনা ওয়াশিংটনের মিত্রদের প্রতি প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিদ্যমান সংশয়কে আরও গভীর করবে, যা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই পুঞ্জীভূত হচ্ছিল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরমাণু প্রতিরোধের বিষয়টি। দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন পরমাণু ছাতার অধীনে সুরক্ষা উপভোগ করে থাকে। তবে সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ বা তার বেশি দক্ষিণ কোরিয়ান নাগরিক নিজস্ব স্বাধীন পরমাণু প্রতিরোধের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানাচ্ছেন। সর্বশেষ এই ঘটনা সেই জনসমর্থনকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
রাফায়েল রশিদ: সিউলে বসবাসকারী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তরিত
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক