স্মরণ
বিভুদার যে প্রশ্নগুলো আমাদেরও ভাবায়
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত বছরের ২১ আগস্ট সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি বিভুরঞ্জন সরকার। পরদিন মুন্সীগঞ্জ এলাকায় মেঘনা নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি সংবাদমাধ্যমে একটি ‘খোলা চিঠি’ পাঠিয়েছিলেন। ফুটনোটে লিখেছিলেন– ‘জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন’।
এক বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, তাঁর লেখাটি আসলে কোনো সরল বিদায়পত্র ছিল না। বরং একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের হিসাবের খাতা– যেখানে জমা আছে বিশ্বাস, অভিমান, ব্যর্থতা, অসুস্থতা, অর্থকষ্ট, পেশাগত অনিশ্চয়তা, ক্ষমতার সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক এবং নিজের জীবনের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের স্বীকারোক্তি।
বিভুরঞ্জন সরকার সাংবাদিকতায় এসেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন সংবাদপত্রের সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্বাসের সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি দৃশ্যমান। স্কুলজীবন থেকেই সাংবাদিকতা, পরে বাম রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান এবং এরশাদবিরোধী সময়ে ছদ্মনামে লেখা– এসব তাঁর জীবনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো তাঁর সাংবাদিকতার নৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিকতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাংবাদিকতা মানে শুধু খবর লেখা নয়; প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়ে সত্য বলা।
‘তারিখ ইব্রাহিম’ নামটি সেই সময়ের সাক্ষী। ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকায় ওই ছদ্মনাম তিনি নিয়েছিলেন নিরাপত্তার জন্য। নাম লুকিয়েছিলেন; সত্য নয়। কিন্তু সাংবাদিকতার এই দীর্ঘ যাত্রার শেষ দিকে এসে তিনি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, যেখানে কলমের শক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছিল। পাঁচ দশকের বেশি সময়ে সাংবাদিকতা করেও তার আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি হয়নি।
মৃত্যুর আগে মানুষ যখন নিজের অতীতের সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনা ও পর্যালোচনা করে, তখন বোঝা যায় তার ভেতরে কতটা দীর্ঘ আত্মসমীক্ষা চলছিল।
প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাও তাঁকে ভারাক্রান্ত করেছে। মেয়ে চিকিৎসক ও বিসিএস কর্মকর্তা হয়েও উচ্চতর পড়াশোনায় সমস্যার মুখে পড়া, বুয়েট থেকে পাস করা ছেলের চাকরি নিশ্চিত না হওয়ার হতাশাও তাঁকে কষ্ট দিত। এই সবকিছুর যোগফলেই হয়তো তাঁর শেষ চিঠির বিষণ্নতা।
এটা কি আত্মহত্যা ছিল? চিঠিতে আত্মহত্যার কোনো সরাসরি পরিকল্পনা নেই। কোনো পদ্ধতির কথা নেই; কোনো নির্দিষ্ট স্থানের কথা নেই; পরিবারের উদ্দেশে কোনো বিদায়বার্তাও নেই। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে হত্যার হুমকির কথা তিনি সরাসরি লেখেননি। মেঘনায় তিনি কীভাবে গেলেন; বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাঁর গতিবিধি কী ছিল; শেষ কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল; ময়নাতদন্তে কী পাওয়া গিয়েছিল– এসব প্রশ্নেরও উত্তর নেই।
বিভুরঞ্জন নিজের জীবনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছিলেন– ‘আমার জীবনে কোনো সাফল্যের গল্প নেই।’ এই কথাটিই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল আত্মমূল্যায়ন।
একজন মানুষের সাফল্য শুধু তার ব্যাংক হিসাব, পদবি কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠায় মাপা যায় না। পাঁচ দশকের বেশি সময় একটি বিশ্বাস নিয়ে কলম চালিয়ে যাওয়া; নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস রাখা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের দুঃখের মধ্যেও লেখা– ‘পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক’– এমন উত্তরাধিকারও ছোট নয়।
বিভুদার ‘খোলা চিঠি’ তাই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। এটি একজন মানুষের ব্যক্তিগত ভাঙনের গল্প; একই সঙ্গে একটি পেশার সংকটের গল্প।
বিভুদাকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তাঁর শেষ দিনের অন্ধকারও হয়তো সবটা আর কখনও আলোকিত হবে না। কিন্তু তাঁর লেখা আমাদের হাতে আছে। সেই লেখার সবচেয়ে মূল্যবান অংশ কোনো অভিযোগ নয়; কোনো নামও নয়। মূল্যবান হলো প্রশ্নগুলো। একজন মানুষ কেন এত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে নিজের জীবনকে ব্যর্থ বলে মনে করেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই হয়তো বিভুদার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা। কারণ তিনি সারাজীবন অন্যের সত্য লিখেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের জীবনও আমাদের সামনে একটি সত্য অনুসন্ধানের তাগিদ রেখে গেছে।
চিররঞ্জন সরকার: কলাম লেখক; বিভুরঞ্জন সরকারের কনিষ্ঠ ভ্রাতা
- বিষয় :
- স্মরণ