ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি

আমাদের দিন-গোনার দিন শেষ হবে?

আমাদের দিন-গোনার দিন শেষ হবে?
×

মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘের অধীনে আফগানিস্তানে যখন চাকরি করি, তখন ওখানে প্রতি ৪২ দিন বা ছয় সপ্তাহ পরপর এক সপ্তাহের রেস্ট অ্যান্ড রিকুপারেশন বা ‘আরঅ্যান্ডআর’ ছুটির বিধান ছিল। এটি মূলত অত্যন্ত বিপজ্জনক, ঝুঁকিপূর্ণ এবং কঠিন কর্মস্থলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি দূর করার জন্য নিয়মিত ও সবেতন বিরতি। ওই সময় এক ‘আরঅ্যান্ডআর’ থেকে কর্মস্থলে ফিরেই পরের ‘আরঅ্যান্ডআর’-এর দিন গোনা শুরু করতাম। শুধু ভাবতাম, কবে ৪২ দিন শেষ হবে! 

আসলে সব মানুষই জীবনের কোনো না কোনো সময় কোনো না কোনো লক্ষ্য সামনে রেখে দিন গুনে চলেন। একজন মানুষ যখন প্রেমে পড়েন, তখন তিনি সারাক্ষণ দিন গোনেন– কখন তার প্রেমাস্পদের সঙ্গে দেখা হবে। একজন কৃষকের ক্ষেতে যখন কাঁচা ধান ঢেউ খেলতে থাকে; মাঠের দিকে তাকিয়ে তিনি দিন গোনেন– কখন তা পাকবে। একজন নিম্ন আয়ের কর্মচারী মাসের মাঝামাঝি থেকেই দিন গোনা শুরু করেন– কখন মাস শেষ হবে আর তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে নতুন মাসের বেতন। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের ব্যাংক বা এনজিও লোনের কিস্তি পরিশোধের জন্য যে দিন গোনা, তার মতো মর্মন্তুদ মনে হয় আর কিছু হয় না।

সাধারণভাবে দিন গোনা প্রতীক্ষারই নামান্তর। কিন্তু সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যখন জাতীয় কোনো সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, তাঁর সামনে দিন গোনা ছাড়া আর কিছু করার নেই, তখন তা আর প্রতীক্ষা থাকে না; হয়ে ওঠে অসহায়ত্বের নির্মম প্রকাশ। ঠিক এমনটিই ঘটেছে আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর বেলায়।
দেশের সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে গত ১৩ আগস্ট সিপিডি আয়োজিত ‘নেভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আসলে আমার কিছু করার নেই। এখন আমি গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না বা উইদাউট এফএসআরইউ আমার যে গ্যাস আছে, সেটি নামাতেও পারব না। এখন শুধু আমাকে দিন গোনা আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছে এফএসআরইউতে, এটি করা ছাড়া আমার কিছু করার নেই।’

উল্লেখ্য, গত ২১ জুলাই এক অগ্নি দুর্ঘটনায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি (এফএসআরইউ) বন্ধ হয়ে যায়। এটি প্রতিদিন ২৫০-৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করত। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে গিয়ে সংকট সৃষ্টি হয়। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ে আবাসিক রান্না, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ওই ঘটনার পর প্রায় এক মাস পার হতে চলল; পরিস্থিতির তেমন রকমফের হচ্ছে না। মাঝখানে ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন পরই তাতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এর পর থেকেই টার্মিনালের কাজ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। এই বাস্তবতাতেই মন্ত্রী মহোদয় উপরোক্ত মন্তব্য করেছেন।

প্রশ্ন হলো– মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরপরই বোঝা যাচ্ছিল, দেশ তীব্র গ্যাস সংকটে নিপতিত হবে এবং লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং সরকারের প্রেস উইংয়ের দায়িত্ব ছিল অবস্থার ওপর টাইম টু টাইম আপডেট দিয়ে জনগণকে অবহিত রাখা; এমনকি সরকার সংকট মোকাবিলায় কী কী উদ্যোগ নিচ্ছে, সেটিও জানানো। কিন্তু সেটি হয়নি; উল্টো এক দিনের ব্যবধানে একই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজনের বক্তব্য ছিল দুই রকম। মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যেখানে বলছেন, লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে দিন গোনা বা পরিস্থিতি মেনে নেওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে সরকারের আর কিছু করার নেই। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দাবি করেছেন, সরকার সংকট নিরসনে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
স্বীকার্য, মন্ত্রী যে প্রযুক্তিগত বাস্তবতার কথা বলেছেন, তা সত্য। এফএসআরইউ চালু হওয়া ছাড়া সমুদ্র থেকে তরলীকৃত গ্যাসকে ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় আনার বিকল্প সত্যিই সীমিত। এটি কারিগরি সীমাবদ্ধতা; অজুহাত নয়। কিন্তু বাস্তবতা মেনে নেওয়া আর প্রকাশ্যে অসহায়ত্ব ঘোষণা– দুইয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। একজন প্রকৌশলী বা টেকনিশিয়ান বললে সেটি পেশাগত মূল্যায়ন; একজন মন্ত্রী বললে সেটি রাষ্ট্রের অবস্থান। 

মন্ত্রী যখন জাতীয় সংকট নিয়ে নিজের ভাষায় কথা বলেন, তখন তিনি একই সঙ্গে বাস্তবতার বর্ণনাকারী ও নীতির প্রতিনিধি। দুটো ভূমিকা মিলিয়ে ফেললেই বিপত্তি। একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী প্রকাশ্যে অসহায়ত্ব ঘোষণা করতে পারেন না। কোনো রোগীকে অস্ত্রোপচার টেবিলে শুইয়ে রেখে চিকিৎসক কখনোই বলতে পারেন না– আমার কিছু করার নেই, দেখি কী হয়।
কোনো ক্ষেত্রে দৈব-দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। দক্ষ ব্যবস্থাপক তা মোকাবিলায় আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি টার্মিনালের ক্ষেত্রে সেই সতর্কতামূলক এবং বিকল্প ব্যবস্থা কেন থাকবে না? দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে একটি মাত্র ভাসমান টার্মিনালের ওপর এতটা নির্ভরশীল করে তোলার যুক্তিই বা কোথায়? বিকল্প ব্যবস্থা, রিজার্ভ সক্ষমতা, জরুরি মেরামতের প্রস্তুতি; রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের একটা স্থাপনার ক্ষেত্রে এসব তো সার্বক্ষণিক বিবেচনার বিষয়। কিন্তু সার্বিক অবস্থা থেকে তো মনে হয়, এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না। এখন যখন ব্যথাটা প্রকট আকার ধারণ করেছে, তখনই মন্ত্রী মহোদয় দিন গোনার ওজর খুঁজছেন। এসবই দূরদর্শিতার অভাব প্রকট করে তুলেছে।

এ-ও সত্য, আমাদের দেশে প্রতিটি সংকটের পর আমরা কিছুদিন ক্ষোভ জানাই; সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা করি। তারপর নতুন সংকট এলে পুরোনোটা ভুলে যাই। মন্ত্রীরাও জানেন, এই দিন গোনার রাজনীতি তাদের জন্য নিরাপদ। কারণ, জনগণও এক ধরনের দিন গোনায় অভ্যস্ত। গুনতে গুনতে যখন দিন শেষ হয়ে যায়, পুরোনো দিনের কথা আর মনে থাকে না।
আশা করতে পারি, এফএসআরইউ হয়তো একদিন মেরামত হবে; গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হবে; লোডশেডিংও কমবে। কিন্তু আবার যদি সংকট আসে, তখনও কি আমরা শুনব– ‘আমার কিছু করার নেই, শুধু দিন গোনা ছাড়া?’ উত্তর হ্যাঁ হলে বুঝতে হবে, সমস্যা কোনো একটি টার্মিনাল বা একজন মন্ত্রীর নয়; সমস্যাটা আমাদের সামগ্রিক পরিকল্পনাহীনতার। সেটি প্রতিটি সংকটেই নতুন মোড়কে ফিরে আসে অথচ কখনও সংশোধিত হয় না। সে কারণেই প্রশ্ন– আমাদের এই দিন গোনার দিন শেষ হবে কবে কিংবা আদৌ কি শেষ হবে?

মোশতাক আহমেদ: কলাম লেখক; 
সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা

আরও পড়ুন

×