শিশু শিক্ষা
প্রাক-প্রাথমিক: আনন্দের পাঠ নাকি যান্ত্রিকতার শৃঙ্খল?
চার-পাঁচ বছরের কচি শিশুগুলোকে আটকে রাখা হচ্ছে এক যান্ত্রিক পড়ালেখার নিগড়ে।
জগজ্জীবন বিশ্বাস
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৫১
বর্তমান সরকার প্রাথমিক স্তর থেকেই খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এ সংক্রান্ত নতুন চারটি বিষয় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামেও একটি বিষয় যুক্ত হচ্ছে। এসব নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তবে বিদ্যমান ব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদ না করে নতুন কিছু শুরু করা সংগত নয়। তাই সবার আগে শিশুর প্রারম্ভিক শিক্ষার বর্তমান হালচালের দিকে দৃষ্টি ফেরানো জরুরি। এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক শিশু-শিক্ষা এবং বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক স্তরে চার থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুর প্রারম্ভিক শিক্ষার আয়োজন যেভাবে চলছে, সেটা না জানলে এই প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব বোঝা যাবে না।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে প্রাথমিক শিক্ষার মূলধারায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করার পেছনে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক, আন্তর্জাতিক, বৈজ্ঞানিক ও জাতীয় পটভূমি রয়েছে। আন্তর্জাতিক নানা লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবেই প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার মূল কাঠামোয় আনা জরুরি হয়ে পড়ে। জমতিয়েন সম্মেলন (১৯৯০) ও ডাকার ঘোষণায় (২০০০) ‘সবার জন্য শিক্ষা’ এই নীতি বাস্তবায়নে বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করতে প্রাক-প্রাথমিক বা প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের ওপর জোর দেওয়া হয়। জাতিসংঘের এসডিজি-৪-এর অনুচ্ছেদ ৪.২-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সকল শিশুর জন্য মানসম্মত প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ, পরিচর্যা ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা প্রাথমিক শিক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
আধুনিক বিজ্ঞান ও শিশু মনস্তত্ত্ব প্রমাণ করেছে যে একজন মানুষের মস্তিষ্কের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ বিকাশ ঘটে জীবনের প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে। বয়স পাঁচ বছর হওয়ার আগেই শিশুর ভাষা, কৌতূহল, সামাজিক মেলামেশা ও আবেগিক ভিত্তি তৈরি হয়। সে জন্য প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির আগেই আনন্দময় ও খেলাভিত্তিক বিভিন্ন অনুশীলনের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। এভাবে শৈশবকালীন পরিচর্যা পেলে শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত হয় এবং বিদ্যালয়ের প্রতি ভীতি দূর হয়। এ ছাড়া জাতীয় শিশুনীতি (১৯৯৪ ও ২০১১) এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিশুর প্রাথমিক বিকাশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে। একীভূত শিক্ষা বাস্তবায়নে, অর্থাৎ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এবং প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের শৈশব থেকে সমাজের মূলধারায় মিশে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে প্রাক-প্রাথমিকের ভূমিকা অপরিসীম।
তদুপরি, আমাদের আবহমান বাংলার যৌথ পরিবার আজ বিলুপ্তপ্রায়। যৌথ পরিবারে শিশুরা পরিবারের বিভিন্ন বয়সী স্বজনদের সান্নিধ্যে একটি উদার উন্মুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠত স্বাচ্ছন্দ্য। সঙ্গে ছিল গ্রামীণ জনপদের অবারিত প্রকৃতি আর বিভিন্ন বয়সী খেলার সাথী। শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো সেখানে অনায়াসে পাওয়া যেত। এখন দিন বদলেছে, একক পরিবারে অধিকাংশ শিশু কেবল মা-বাবার স্নেহ-যত্নে বড় হচ্ছে। তার কোনো খেলার সাথী নেই, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ নেই, আত্মীয় বা প্রতিবেশী নেই, খোলা আকাশ নেই, খেলার মাঠ নেই। আছে কেবল চারদেয়ালে ঘেরা এক আশ্রয় আর প্রতিযোগিতা করে সামনে এগিয়ে যাবার মহড়া। এ প্রেক্ষিতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক শৈশবে বিকাশের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ২০১০-১১ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু করা হয়। এর জন্য আলাদা শিক্ষক নিয়োগ, বিশেষ প্রশিক্ষণ, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষকে রং-বেরঙে সুসজ্জিত করা এবং খেলনা ও বিশেষ শিখনসামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে চার থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের জন্য দুই বছর মেয়াদি করার পরিকল্পনাও জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ণমালা শেখানোর কোনো ধাপ নয়, এটি হলো শিশুকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা, সামাজিক দক্ষতা বাড়ানো এবং ঝরে পড়া রোধ করে একটি শক্তিশালী শিক্ষাজীবনের ভিত্তি স্থাপন করা।
আজকের প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষগুলোর দিকে তাকালে এক চরম বৈপরীত্য চোখে পড়ে। যে বয়স হওয়ার কথা ছিল অবাধ খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গল্প শোনা আর কৌতূহল মেটানোর, সেখানে চার-পাঁচ বছরের কচি শিশুগুলোকে আটকে রাখা হচ্ছে এক যান্ত্রিক পড়ালেখার নিগড়ে। কোমল হাতগুলোতে পেন্সিল চেপে ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলছে অক্ষর ও সংখ্যা লেখার মহড়া। জাতীয় শিক্ষানীতি, শিক্ষাক্রম ও শিশুমনোবিজ্ঞানের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে– প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা হবে সম্পূর্ণ খেলাভিত্তিক ও আনন্দময়। অথচ বাস্তব চিত্রটি ঠিক বিপরীত। এই যে শৈশবকে দুমড়ে-মুচড়ে শৈশবকালেই লেখাপড়ার অতিযান্ত্রিক মহড়া চালানো হচ্ছে, এটি কেবল শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করছে না, বরং একটি প্রজন্মকে অসম্পূর্ণ মানসিক বিকাশ নিয়ে পরবর্তী জীবনে ঠেলে দিচ্ছে। স্নায়ুবিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান আমাদের বারবার সতর্ক করে দিয়েছে যে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে শিশুর মস্তিষ্কের নিউরাল সংযোগগুলো সবচেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়। এই বয়সে শিশুর প্রধান কাজ হলো সামাজিক ও আবেগিক বিকাশ, নিজের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে শেখা, সহপাঠীর সঙ্গে আনন্দ ভাগ করা, কৌতূহল প্রকাশ করা এবং পর্যবেক্ষণ শক্তির উন্মেষ ঘটানোর মাধ্যমে জীবন ও পরিবেশকে চেনা।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা শেয়ার করা, হার মেনে নেওয়া এবং অন্যের অনুভূতিকে সম্মান করা শেখে। যখন একটি চার বছরের শিশুকে এসব স্বাভাবিক বিকাশ থেকে বঞ্চিত করে জোরপূর্বক বই-খাতার শৃঙ্খলে বাঁধা হয়, তখন তার মানসিক বিকাশ থমকে যায়। প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে মেতে থাকায় তারা এই মানবিক গুণগুলো শেখার সুযোগ পায় না। ফলে বড় হয়ে সমাজে তাদের মধ্যে চরম অসহিষ্ণুতা ও একাকিত্ববোধ দেখা যায়। যে শিশুটি সামাজিক মেলামেশা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং কৌতূহলের মতো মৌলিক জীবনদক্ষতা না শিখে কেবল কিছু অক্ষর মুখস্থ করে প্রাক-প্রাথমিক পার হয়, সে মূলত এক ভঙ্গুর ভিত্তি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশ করে। এর কুফল আমরা পরবর্তী শিক্ষাস্তরগুলোতে হাতেনাতে দেখতে পাই শিখন ঘাটতির নামে। শ্রেণিকক্ষে সামান্য প্রতিকূলতায় এরা ভেঙে পড়ে, দলগত কাজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না এবং সমস্যার মুখোমুখি হলে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই ভ্রান্ত চর্চার প্রভাব কেবল স্কুলের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা সমাজদেহে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। আজ সমাজে আমরা যেসব হিংস্রতা, সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয়, তরুণ প্রজন্মের আত্মকেন্দ্রিকতা এবং চরম মানসিক বিষণ্নতা দেখছি, তার শিকড় কিন্তু শৈশবের ভুল পরিচর্যার ভেতরই প্রোথিত।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার এই বিকৃতি রোধে আমাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষে যে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা, বাড়ির কাজ এবং জোরপূর্বক লেখানো সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। খেলনা, ছবি আঁকার কাগজ, রং, মাটির কাজ, গল্প ও খেলাধুলার মাধ্যমেই হবে শিক্ষণ। বাবা-মাকে বোঝাতে হবে যে চার বছরের শিশুর আসল কৃতিত্ব ১০টি শব্দ লেখা নয়, বরং সে হাসিমুখে স্কুলে আসছে কিনা এবং সহপাঠীর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে কিনা সেটিই মুখ্য। শিক্ষকদের এই বিষয়ে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যেন তারা অভিভাবকের চাপে পড়ে শিশুদের ওপর বই-খাতার বোঝা চাপিয়ে না দেন। একটি ভবনের ভিত্তি যদি কাঁচা হয়, তবে ওপরের তলা যতই সুসজ্জিত হোক না কেন, তা ধসে পড়তে বাধ্য। প্রাক-প্রাথমিক বা শিশুর প্রারাম্ভিক শিক্ষা হলো শিকড়ে পুষ্টি জোগানোর শিক্ষা। আমরা যদি চার-পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মুক্তভাবে হাসতে, খেলতে এবং অনাবিল কৌতূহল নিয়ে বিশ্বকে দেখতে না দিই, তবে আমরা একটি মানসিকভাবে অপূর্ণ ও ভারসাম্যহীন প্রজন্ম গড়ে তুলব।
জগজ্জীবন বিশ্বাস: শিক্ষাকর্মী ও গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শিশু
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান