চারদিক
বরেন্দ্র অঞ্চলের নতুন সম্ভাবনা
কাজী কামাল হোসেন
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
একসময় ‘বরেন্দ্র অঞ্চল’ বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠত শুষ্ক রুক্ষ মাটি, তীব্র খরা, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট আর প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিরন্তর লড়াই। সেই কঠিন বাস্তবতা জয় করেই এ অঞ্চলের কৃষক আজ বরেন্দ্রকে দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্যভান্ডারে পরিণত করেছেন। বিশেষ করে নওগাঁ এখন ধান ও আম উৎপাদনের মাধ্যমে জাতীয় কৃষি অর্থনীতির এক অপরিহার্য চালিকাশক্তি। তবে কৃষির এই অভাবনীয় সাফল্যের বিপরীতে উচ্চশিক্ষা, উদ্ভাবনী গবেষণা ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায় দীর্ঘদিন এই জনপদকে নির্ভর করতে হয়েছে রাজশাহী, বগুড়া কিংবা ঢাকার ওপর।
সেই দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক নির্ভরতা কাটানোর এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে নবপ্রতিষ্ঠিত নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় ও নওগাঁ মেডিকেল কলেজ। কৃষিনির্ভর নওগাঁকে একটি আধুনিক, উদ্ভাবনী ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের মূল ভিত্তি হতে পারে এই দুটি প্রতিষ্ঠান।
যে কোনো বড় পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হয় ছোট কিন্তু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে দুটি বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সবচেয়ে আশার কথা হলো, এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘কৃষি’ এবং ‘আইন’ বিভাগ
অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। অন্যদিকে, নওগাঁ মেডিকেল কলেজ আপাতত নওগাঁ সদর হাসপাতাল ভবনের অবকাঠামো ব্যবহার করেই তাদের একাডেমিক ও প্রাথমিক সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বরেন্দ্রের আবহাওয়া, খরা, মাটির ক্ষয়, অণুজীব ও ভূগর্ভস্থ পানির সংকট সমাধানের মতো বিষয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাগার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অন্যদিকে, মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকদেরও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি, পুষ্টি, নতুন ধরনের রোগব্যাধি ও অঞ্চলভিত্তিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণায় যুক্ত থাকা প্রয়োজন। একটি মানসম্মত মেডিকেল রিসার্চ সেন্টার চালু করা গেলে তা চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে বরেন্দ্র অঞ্চলের নিজস্ব তথ্য ও উপাত্ত যুক্ত করতে পারবে। বিজ্ঞানভিত্তিক এই যৌথ গবেষণা চর্চাই প্রতিষ্ঠান দুটিকে দেশের অন্যান্য প্রচলিত প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা পরিচিতি দেবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি গবেষণাকে সরাসরি স্থানীয় কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ধানের পাশাপাশি নওগাঁর আমের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিশাল। তবে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক সংরক্ষণের অভাবে কৃষক প্রায়ই ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক অ্যাগ্রো-প্রসেসিং ও ফুড টেকনোলজি ল্যাব গড়ে উঠলে কৃষিপণ্য থেকে প্রসেসড ফুড তৈরি ও নতুন অর্থনৈতিক দুয়ার খুলবে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নওগাঁসহ আশপাশের জেলার মানুষকে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো। জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে এই যাতায়াত কেবল ব্যয়বহুলই ছিল না, অনেক ক্ষেত্রে জীবনঝুঁকিও বাড়িয়ে দিত।
জেলা হাসপাতালের ভবনে শুরু হওয়া নওগাঁ মেডিকেল কলেজকে দ্রুত একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত হাসপাতালে উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনীয় শয্যা, আইসিইউ, সিসিইউ, ট্রমা সেন্টার এবং বিশেষায়িত বিভাগ চালু হলে এ অঞ্চলের মানুষকে আর দূরদূরান্তে ছুটতে হবে না। একই সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ ঘিরে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ওষুধশিল্প, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নার্সিং ইনস্টিটিউট ও স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক সহায়কমূলক বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজকে আলাদা দুটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে, এ দুটিকে ঘিরে একটি সমন্বিত ‘জ্ঞান-স্বাস্থ্যসেবাবলয়’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল হাসপাতালকে কেন্দ্র করে শহরের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক গতি আসবে। আবাসন, খাদ্য, পরিবহন ও শিক্ষা সহায়ক খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াবে বেসরকারি খাতও। তবে এই সুযোগের পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিকল্পিত নগরায়ণ। এখনই দূরদর্শী নগর পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে অপরিকল্পিত আবাসন, যানজট, ড্রেনেজ সংকট ও পরিবেশ দূষণের মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই প্রশস্ত সড়ক, মানসম্মত গণপরিবহন এবং পরিবেশবান্ধব ভৌত অবকাঠামো নিশ্চিত করার এখনই উপযুক্ত সময়।
কাজী কামাল হোসেন:
সাংবাদিক, নওগাঁ
- বিষয় :
- চারদিক