ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রশাসন

রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা ব্যক্তিমালিকানায় দিলেই শিল্পায়ন ঘটে না

রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা ব্যক্তিমালিকানায় দিলেই শিল্পায়ন ঘটে না
×

আখতার সোবহান মাসরুর

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চিনিকল, বস্ত্রকল, রাসায়নিক শিল্প, পাটকল, স্টিল ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের অবকাঠামোর সঙ্গে রয়েছে জমি ও ভবন। চিনিকলগুলোর আখ চাষের ১০ হাজার একর কৃষিজমিও নিলামে উঠবে একই সঙ্গে। প্রতিযোগিতা চলছে কে নেবে? ইতোমধ্যে শ্রমিকরাও রাস্তায় নেমে বেসরকারীকরণ প্রচেষ্টার প্রতিবাদ করছেন। 
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের বেসরকারীকরণ চালু হয়েছিল গত আশির দশকে। চার দশকের অভিজ্ঞতার পর বলা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করলেই শিল্পায়ন ঘটে না। শিল্পায়ন মানে পুঁজির উৎপাদনশীল বিনিয়োগ। বাংলাদেশের লুটেরা শ্রেণি বিনিয়োগ নয়, লুটপাট ও দখল করে অতি সহজে সম্পদের পাহাড় গড়তে চায়। এ ক্ষেত্রে বেসরকারীকরণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের এক দারুণ উৎসব। 
১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত করার ফলে ১৯৭২ সালের মধ্যেই শিল্পের ৯২ শতাংশ রাষ্ট্রের মালিকানায় আসে। মূলত ব্যক্তির হাতে বড় পুঁজি না থাকায় রাষ্ট্রকেই সে সব শিল্পের দায়িত্ব নিতে হয়। কিন্তু দুর্নীতি, পুনর্বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির নবায়ন না করায় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে লোকসান হতে থাকে। তা দেখিয়ে সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে বেসরকারীকরণ শুরু হলেও, আশির দশকে জেনারেল এরশাদের আমলে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় ব্যাপকহারে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বেসরকারীকরণ ঘটে। লুটপাটের মধ্য দিয়ে পুঁজির আদিম সঞ্চয় ঘটে, গঠিত হয় নব্য ধনিক শ্রেণি। 

তবে ১৯৯৪ সালের বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ৪৮৮টি বিরাষ্ট্রীয়কৃত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় যে, মাত্র ২১৪টি (৪৩.৯%) প্রতিষ্ঠান তখনও চালু ছিল; ১৩৩টি (২৭.৩%) বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আর ১৪১ (২৮.৯%) কোনো হদিসই পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, মোট ৪৮৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৭৪টি, ৫৬%, হয় বন্ধ, নয়তো কার্যত অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং, শুধু মালিকানা হস্তান্তরকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরা যায় না।

বাংলাদেশে বেসরকারীকরণ আসলে ব্যক্তিমালিকানায় উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবর্তে জমি-ভবন-যন্ত্রপাতি বেচে, ব্যাংকঋণ নিয়ে মেরে দেওয়াই মূল আকর্ষণ। এটি কোনো পদ্ধতিগত পুঁজিবাদ নয়, বরং দখলের অর্থনীতি। রেন্ট-সিকিং বা দখলের অর্থনীতি এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা; যেখানে নতুন সম্পদ সৃষ্টির পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব, লাইসেন্স, ব্যাংকঋণ ও সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে সম্পদ দখল বা অতিরিক্ত সুবিধা আদায় করা হয়। কেবল কলকারখানাই নয়, আশির দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মেরে দেওয়াটাই হয়ে উঠেছিল ধনিক শ্রেণি গঠনের সহজ পথ। খেলাপি ঋণের নামে ব্যাংক লুট এখনও অব্যাহত রয়েছে। 

বেসরকারীকরণের আরও একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল শ্রমিকশক্তির কেন্দ্রগুলো ভেঙে ফেলা। আদমজী, টঙ্গী, তেজগাঁও, কালুরঘাটসহ অন্যান্য শ্রমিকশক্তির কেন্দ্রগুলো আজ আর নেই। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কিংবা এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিকশক্তি যে প্রতিরোধ তৈরি করেছিল সেটি আজ অনুপস্থিত। এই দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ নিতে চায় সরকার। 
বাংলাদেশের বেসরকারীকরণ বিষয়ে চীনের শিক্ষা নকল না করেও তাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। রাষ্ট্র বনাম বাজারের দ্বৈততার বাইরেও পথ আছে। চীন সংস্কার করতে গিয়ে সব রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প বেচে দিয়ে এক লাফে চরম বাজারনির্ভর পুঁজিবাদে যায়নি। কৌশলগত ও বৃহৎ শিল্পের বড় অংশ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রেখে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতামূলক বেসরকারীকরণ ও বাজার প্রতিযোগিতার সুযোগ দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পকে তারা দুভাগে ভাগ করেছে, জনস্বার্থমূলক ও বাণিজ্যিক। শুধু বাণিজ্যিক শ্রেণির শিল্পে মিশ্র মালিকানা দিয়েছে। 
পুঁজির বিশ্বায়নের এই কালে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা, সরবরাহ ব্যবস্থায় আমাদের অবস্থান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত প্রযুক্তির বিকাশ ও গ্রিন ম্যানুফ্যাকচারিং–এসব মাথায় রেখে বাংলাদেশকে আগামী দুই দশকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি নিতে হবে। শিল্প কারখানার লাভ-লোকসান এখন বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত সাত সহস্রাধিক পণ্য শূন্য শুল্কে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেবার পরে এ দেশের শিল্পকারখানা ও কৃষি কতটা টিকে থাকতে পারবে–সেটিও এক বড় প্রশ্ন।

ড. আখতার সোবহান মাসরুর: লেখক ও গবেষক 
 

আরও পড়ুন

×