চারদিক
চায়না দুয়ারি জালের বিস্তার
বিভূতি ভূষণ মিত্র
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাছ ধরার এক ধরনের জাল হলো চায়না দুয়ারি। এটি ক্ষতিকর এবং দেশে নিষিদ্ধ। এ ধরনের জালে প্লাস্টিকের গোল রিং থাকে। অনেক জালে লোহার রিংও থাকে। সঙ্গে থাকে সূক্ষ্ম নেটের ফাঁস। এর ভেতরে মাছ ঢোকার অনেক দুয়ার থাকে। কিন্তু একবার মাছ বা অন্য কোনো জলজ জীব এতে প্রবেশ করলে আর বেরোতে পারে না।
এ ধরনের জাল অনেক সূক্ষ্ম হওয়ায় ছোট ছোট পোনা যেমন আটকে যায়, তেমনি ডিমওয়ালা বড় মাছও। এ ছাড়া এতে জলজ প্রাণী যেমন সাপ, কুঁচিয়া, ব্যাঙ, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক প্রভৃতিও আটকে যায়। ফলে জলজ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
২০২১ সালের দিকে এই চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বাড়তে শুরু করে। প্রথমদিকে পদ্মা নদীর তীরে এই জাল ব্যবহার করে মাছ ধরা হতো। ধীরে ধীরে এটি সমস্ত দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। এটা এক ধরনের ফাঁদ। এই জালের বুনন এমন, এক গিঁট থেকে আরেক গিঁটের দূরত্ব অনেক কম। এই জাল ৫০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত দীর্ঘ। প্রস্থ এক থেকে দেড় ফুট।
কারেন্ট জাল নিষিদ্ধ হওয়ার পর চায়না দুয়ারি জাল অনেক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে জেলেদের কাছে। এর মূল কারণ এই জালে বেশি মাছ আটকায়। পরিশ্রমও কম। তবে দাম বেশি হওয়ায় অনেক গরিব জেলে এটি ব্যবহার করতে পারছে না। এ ধরনের জালে ছোট-বড় যে কোনো মাছ তো বটেই, নানা ধরনের জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে। এতে জলজ প্রাণীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী তপশিল-১ মতে ২৫ প্রজাতি এবং তপশিল-২ মতে ৫২ প্রজাতির মাছ সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে। এসব প্রজাতির মাছ ধরা, বিক্রি, বিপণন করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এসব মাছ বন্যপ্রাণী হিসেবে গণ্য হবে, বলা হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে মাছ ধরার ফাঁদ, যে কোনো আকারের ফাঁসযুক্ত জাল ব্যবহার করে প্রস্তুতকৃত কোনো ফাঁদ, এর উৎপাদন, বিপণন, বহন, পরিবহন, দখলে রাখা; বছরের যে কোনো সময় যে কোনো জলাশয়ে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।
প্রজ্ঞাপনে মাছ ধরার প্রচলিত জালের নাম উল্লেখ করা হয় চায়না দুয়ারি, আর স্থানীয় নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয় চায়না চাঁই, ম্যাজিক চাঁই, চায়না দুয়ার, চায়না বান্ধা ও রিং জাল।
বাংলাদেশের মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, উন্মুক্ত জলাশয়ে জন্মানো প্রতিটি মাছকে একবার ডিম ছাড়া ও বাচ্চা ফোটানোর সুযোগ দিতে হবে। এর আগে এসব মাছ ধরা-মারা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। নদীগুলোতে বিকেল হলেই এই জাল ফেলা হয়। নদীতে থাকা প্রায় সব জলজ প্রাণী এ জালে আটকে পড়ে। এমনকি মাছের ডিমও এতে আটকে থাকতে দেখা যায়।
এই জাল ব্যবহারের ফলে আরেকটি সংকট দেখা যাচ্ছে। যেসব জেলে সনাতন পদ্ধতিতে মাছ ধরেন, তারা তেমন মাছ পাচ্ছেন না। অধিকাংশ শৌখিন মৎস্য শিকারি এই জাল ব্যবহার করছেন। এ অবস্থায় সরকারকে এই জাল ব্যবহারে নজরদারি বাড়াতে হবে। এমনকি প্রকাশ্যে অনলাইনেও এ জাল বিক্রি করা হচ্ছে। যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এ জাল, তাতে কড়া নজরদারি ও উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা না নিলে জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র: পরিবেশবিষয়ক লেখক
- বিষয় :
- চারদিক