আন্তর্জাতিক
ইসরায়েলের ‘ইসলামোফোবিয়া’ অস্ত্র
যশ পল
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
একজন রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যের সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রধানের বৈঠকটি ছিল দীর্ঘ ও কার্যকর। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল সম্পর্কিত নীতি নিয়ে আলোচনা করেছি। দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি তথা যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের অনেক সদস্যের সংশয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। রিপাবলিকানদের সংশয় থাকলেও বিষয়টি তারা প্রকাশ করতে পারছেন না। কারণ এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে দৃঢ়ভাবে। তবে শেষে একটি বিষয় আমি তুলেছি: সদ্য গঠিত ‘শরিয়া-ফ্রি আমেরিকা ককাস’-এ অংশগ্রহণ। এটি এমন এক দল মার্কিন প্রতিনিধি, যারা ‘ধর্মের নামে সহিংসতা, নারীদের প্রতি নির্যাতন এবং নির্মম রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। এমন আইন ও প্রথার আমেরিকার সমাজে কোনো স্থান নেই।’
তিনি হাত নাড়িয়ে বলেন, ‘এ নিয়ে চিন্তা করবেন না; মুসলমানরা তো কেবল সহজ লক্ষ্য। সমস্যাটা ভারতীয়দের নিয়ে, আর সাধারণভাবে বাদামি মানুষদের নিয়ে। ইহুদিদের নিয়েও বটে। এটি আমেরিকা ফার্স্ট নীতির পথে বাধা হবে না। আসলে ককাসে একমাত্র সদস্য, যিনি ইসরায়েল নিয়ে সব বাজে কথায় বিশ্বাস করেন, তিনি হলেন র্যান্ডি ফাইন।’
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া উস্কে দেওয়ার প্রবণতা এখন দৃশ্যমান এবং স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকেই প্রায় নস্টালজিয়ার মতো জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়ে ফিরে যান। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পর তিনি একটি মসজিদে গিয়ে ঘোষণা করেছিলেন– ‘ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম।’ অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার সেই প্রচেষ্টা থেকে রিপাবলিকান পার্টি প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার জায়গায় এসেছে প্রকাশ্য বিদ্বেষ, যা মুসলমানদের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। যেমন মে মাসে সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে গুলিবর্ষণ হয়, যেখানে দুজন মুসলিম এবং একজন নিরাপত্তারক্ষী প্রাণ হারান। সম্প্রতি ডালাস ফোর্ট ওর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে, যেখানে মুসলমানদের (এবং সম্ভবত অন্য যাদের পা ময়লা তাদের) জন্য অদৃশ্য ফুট-ওয়াশিং স্টেশন বসানোর কথা বলা হয়, যাতে তারা অজু করতে পারে। কিন্তু টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের নিন্দার মুখে দ্রুত সে প্রস্তাব বাতিল করা হয়। তিনি দাবি করেন, এটি বসানো হবে সংবিধানবিরোধী।
এই প্রবণতার উৎস কোথায়? নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৫ সালে তাঁর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই আমেরিকানদের বিভক্ত করেন এই যুক্তিতে, দেশটির শ্বেতাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠের সামাজিক আধিপত্য হুমকির মুখে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে কেবল মুসলমানরা নয়, সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রমণের শিকার হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর আক্রমণ বা হিস্পানিক সংস্কৃতির ওপর প্রশাসনিক আক্রমণ তারই উদাহরণ। তবে এর উৎস ইসলামোফোবিয়া বলে এর আরও পরিকল্পিত নিশানা ও প্রবণতা স্পষ্ট।
চলতি বছর জানুয়ারিতে ইসরায়েল সরকার জেরুজালেমে একটি অ্যান্টি-সেমিটিজম সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে ইউরোপের ডানপন্থি দলগুলোর নেতারা অংশ নেন। পোল্যান্ডের ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি, হাঙ্গেরির ফিডেজ পার্ট, স্পেনের ভক্স পার্টি এবং ফ্রান্সের র্যালি পার্টি। সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুনঃশিক্ষণ প্রক্রিয়ার পর এটি ছিল ইউরোপীয় ডানপন্থিদের সবচেয়ে বড় সমাবেশ, যেখানে অ্যান্টি-সেমিটিজম নিয়ে আলোচনা হয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইউরোপীয় ডানপন্থি নেতাদের মিত্র হয়েছেন। নেতানিয়াহু তাদের ‘কট্টরপন্থি ইসলামের আক্রমণ’-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথা বলেছেন। জানুয়ারি থেকেই তিনি বলে আসছেন এবং সম্প্রতি তিনি সতর্ক করেছেন, ‘প্রথম ইসলামিক প্রজাতন্ত্র যারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে, তা হবে ব্রিটেন।’ পুনর্নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বিলবোর্ড ব্যবহার করেছেন, যেখানে হিজবুল্লাহ ও ইরানি নেতাদের সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান এবং নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির ছবি দেওয়া হয়েছে। বিলবোর্ডে বলা হয়েছে: ‘তাদের জিততে দেবেন না’।
ইসরায়েলের ইসলামোফোবিয়া কেবল নেতানিয়াহু কিংবা তার দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েলের নিজেদের কর্মকাণ্ডের কারণে নিন্দিত, (বিশেষ করে গাজায় তারা যে গণহত্যা চালিয়েছে) তা নিয়ে আত্মসমালোচনা না করে তারা উল্টো প্রচারণাকে বাঁচার উপায় হিসেবে দেখছে। উদাহরণস্বরূপ, তারা ক্লক টাওয়ার এক্স কোম্পানির মাধ্যমে লাখ লাখ আমেরিকানকে স্বয়ংক্রিয় বার্তা পাঠিয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক স্থিতিশীলতা চায়’। একই সঙ্গে তারা সমালোচকদের দুর্বল করার চেষ্টা করছে এবং ইসলামোফোবিয়া উস্কে দিয়ে ডানপন্থিদের একত্র করছে।
ভীতি ও ঘৃণা হলো শক্তিশালী টুলস। বর্তমান ইসলামোফোবিয়া প্রচারণা আরও গভীর ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। এর প্রধান লক্ষ্য পশ্চিমা ডানপন্থিদের মধ্যে ইসরায়েলের সমর্থন ধরে রাখা হলেও এ চেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট নয়। ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের উচিত একে আসল রূপে দেখা: এটি মরিয়া বিদেশি প্রভাব বিস্তারকারী অভিযান, যে অভিযান চালাচ্ছে এমন একটি রাষ্ট্র, যার বিকল্প ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে।
যশ পল: ‘অ্যা নিউ পলিসি’ সংগঠনের
সহপ্রতিষ্ঠাতা; আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক