ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাজ্যে অভিবাসীবিরোধী নজরদারি বাড়ছে

যুক্তরাজ্যে অভিবাসীবিরোধী নজরদারি বাড়ছে
×

সংঘমিত্রা সিং

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্কটল্যান্ডের মানুষের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের খ্যাতি বরাবরই রয়েছে। ইংল্যান্ডকে ইঙ্গিত করে তারা প্রায়ই বলেন, ‘আমরা আমাদের দক্ষিণের প্রতিবেশীদের মতো নই।’ স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর গ্লাসগোর অফিসিয়াল স্লোগান– ‘জনগণই গ্লাসগো গড়ে তুলেছে’, যা টি-শার্ট, দালানকোঠা, বাসস্টপ থেকে শুরু করে চায়ের মগেও চোখে পড়ে। ২০১৮ সালে যখন ভারত থেকে প্রথম স্কটল্যান্ডে আসি, অপরিচিত মানুষ ও প্রতিবেশীদের উষ্ণ ব্যবহারে আমি সত্যিই আপ্লুত হয়েছিলাম। মানুষের কৌতূহল ছিল, কিন্তু তাতে অনধিকার চর্চা ছিল না। তারা লাইনে দাঁড়িয়ে নিয়ম মানতেন। আমাকে বলতেন, আমি যেন তাদেরই একজন। শহরের সংগীত, শিল্প ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ভাবা হতো অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্ষেত্র হিসেবে; যেখানে বৈচিত্র্য, সৃজনশীলতা আর সবাইকে সমাদর করার আহ্বান জানানো হতো।

একজন বহিরাগত হিসেবে এটা স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো ছিল। যেমন নিজের মতো থাকা, একা একা চলতে পারা; একই সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রদায়ের উষ্ণতা অনুভব করা। আমার জীবনটাই বদলে গিয়েছিল। বিশেষ করে একজন নারীর জন্য এমন স্বাধীনতা বিরাট কিছু। কিন্তু কভিড মহামারি, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা আর বছরের পর বছর ধরে চলা সরকারি বাজেট ছাঁটাইয়ের পর পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। এখন চরমপন্থি ডানদের দৌরাত্ম্য আর সহিংসতা ক্রমেই বাড়তে দেখছি, আর নিজের ওপর অনুভব করছি এক বিষাক্ত নজরদারি।

গত জুনে গ্লাসগোর রাজপথে শত শত মুখঢাকা বিক্ষোভকারীর মিছিলকালে চরম বিশৃঙ্খলা ও বর্ণবাদী হামলা ঘটতে দেখেছি। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু ‘গায়ের রঙের কারণে’ এশীয় ব্যবসায়ীরা সেখানে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। আক্রান্ত হয়েছেন সাধারণ মানুষ। ওই মাসেরই শেষ দিকে এডিনবার্গের একটি মসজিদের সামনে মুসল্লিদের ওপর হামলার অভিযোগে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা হয়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওতে তাঁকে চিৎকার করে বলতে দেখা যায়– সে ‘দেশ রক্ষা করছে’। 

জুলাই মাসে গ্লাসগোতে অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভকারীরা; যাদের অনেকেরই ছিল মুখঢাকা এবং বর্ণবাদী স্লোগানে সোচ্চার– আবারও তাণ্ডব চালালে একজন ডেলিভারি ড্রাইভারের ওপর হামলা চালানো হয়। আমরা দেখেছি মসজিদের দেয়ালে ঘৃণা ছড়ানো গ্রাফিতি এঁকে তা বিকৃত করা হয়েছে। নতুন এক তথ্যে দেখা গেছে, ব্রিটেনে প্রতি পাঁচ দিনে গড়ে একটি মসজিদে হামলা চালানো হয়। ফালকার্কের আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলের সামনে বিক্ষোভে এক বক্তার জনতাকে উস্কে দিয়ে বলতে শুনেছি, ‘ব্রিটেনকে শ্বেতাঙ্গদেরই জন্য রেখে দাও।’ এমনকি স্কটিশ পার্লামেন্টের বাইরে ফ্যাসিবাদী কায়দায় মহড়া দিতে দেখা গেছে একাধিক কর্মীকে। ওপরতলার এসব অপপ্রচার যে মাঠ পর্যায়ে বাস্তব সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে, এগুলো তারই প্রমাণ।

এই ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ আমি ব্যক্তিগতভাবেও টের পাই। অপরিচিত মানুষ হুটহাট থামিয়ে আমার জাতীয়তা, উচ্চারণের ধরন, ধর্ম বা পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একবার এক অচেনা লোক সরাসরি আমার মুখের ওপর বলে বসল, আমার উচ্চারণের ধরন নাকি বিদঘুটে! আমি যখন যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি পেতে হিমশিম খাচ্ছি বলে এক পরিচিতের কাছে দুঃখ প্রকাশ করলাম, তিনি বলে বসলেন, অভিবাসীরা স্থানীয়দের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ এখন কথায় কথায় লাইন ভেঙে সামনে চলে যায় এবং মুহূর্তেই গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধায়। যে ‘বহিরাগতদের’ একসময় গ্লাসগো ভালোবেসে আপন করে নিয়েছিল, তারাই আজ ঘৃণা ও সন্দেহের পাত্র।

মানুষ আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকে। গভানের এক পানশালায় এক গ্রাহক উচ্চৈঃস্বরে মন্তব্য করে বসলেন, সব অভিবাসী অপরাধী এবং আমাদের ‘নিজের দেশে ফিরে যাওয়া উচিত’। বাসে এক বয়স্ক নারী আমি আর আমার ধবধবে সাদা স্কটিশ স্বামীর কথাবার্তায় বাধা দিয়ে বলে উঠলেন, আমরা যেন আমাদের কথা বলার ঢং বন্ধ করি। সমস্যাটা কি ছিল আমরা আন্তঃবর্ণের দম্পতি বলে? নাকি আমরা আক্ষরিক অর্থেই স্থানীয়দের মতো কথা বলি না বলে? আমি হয়তো কখনোই তা জানতে পারব না। কিন্তু যে সন্দেহ কয়েক বছর আগেও আমার মাথায় আসত না, তা এখন সব সময় মনের কোণে খিটখিট করতে থাকে।
আমাদের এই উগ্রতা, সহিংসতা আর মানুষকে পর করে দেওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিক হয়ে আসার বিরুদ্ধে সরাসরি ‘না’ বলতে হবে। সবার জীবনের মূল সমস্যা সেই জীবনযাত্রার সংকট ও বৈষম্যের ওপর আলো ফেলতে হবে। 
 
সংঘমিত্রা সিং: মানবাধিকারবিষয়ক 
আইনজীবী ও লেখিকা; দ্য গার্ডিয়ান
থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×