প্রতিবেশী
নেপালের ট্র্যাজেডি ও সতর্কতা আমলে না নেওয়ার বিপদ
বিনোদ ঢাকাল
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৮ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বু ধবার নেপালের যে দুর্যোগ আমরা দেখেছি, দুঃখজনক হলেও সত্য, এটি পুরোপুরি নজিরবিহীন বা অপ্রত্যাশিত ছিল না। মাত্র এক বছর তথা গত বছরের ৮ জুলাই একই নদীপথে প্রায় একই ধরনের বন্যা দেখা গেছে। ওই সময় ৯ জন প্রাণ হারায় ও ১৯ জন নিখোঁজ হয়। নেপাল-চীন সংযোগকারী মিত্রেয়ী ব্রিজ ধ্বংস হয় এবং রসুওয়াগধি ড্রাই পোর্ট ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গতবারের বন্যার কারণ হিসেবে সীমান্ত থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার উত্তরে এবং প্রায় পাঁচ হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত হিমবাহ ভেঙে যাওয়াকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৩ মাসের ব্যবধানে একই নদী ব্যবস্থায় হিমবাহ ভেঙে বিধ্বংসী বন্যা হওয়া কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। বরং বলা যায়, এটি তারই ধারাবাহিকতা। অথচ সে অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের প্রস্তুতির জন্য স্মারক হিসেবে কাজ করার কথা ছিল।
নেপালের হাইড্রোলজি ও মেটিওরোলজি বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যা আঘাত হানার আগের ২৪ ঘণ্টায় রসুয়ায় বৃষ্টির পরিমাণ ছিল একেবারেই সামান্য। বন্যা যখন আঘাত হানে তখন সেখানে পরিষ্কার আকাশ ও রোদ ছিল বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেছেন। নেপালি ও আন্তর্জাতিক হিমবাহ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি হিমবাহ ভেঙে যাওয়া বন্যা। সম্ভবত তিব্বতের উজানে বরফ গলে গিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ইঙ্গিত অনুসারে, তিব্বতে হওয়া ভূমিকম্প হয়তো এর সূচনা করেছিল, যা পরে এই বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। জলবায়ু গবেষকরাও ভূমিকম্পের বিষয়টি সমর্থন করেন। তবে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চীনের মতামতের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। কারণ মূল ঘটনাটি নেপালের সীমানার বাইরে হয়েছিল, যেখানে নজরদারি সীমিত।
এই বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানির একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, রসুয়ার নদী উপত্যকাগুলো অত্যন্ত সংকীর্ণ ও খাড়া, যা বন্যার ধ্বংসাত্মক শক্তি বহুগুণ করে দেয়। প্রশস্ত প্লাবনভূমিতে পানি ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে সংকীর্ণ পথে দ্রুতগতি লাভ করে তীব্র বেগে আছড়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য পথ ও জলবিদ্যুতের অর্থনৈতিক সুবিধার কথা চিন্তা করে তিমুর, স্যাব রুবেসি ও ভাটির এলাকাগুলোতে একদম নদীর তীর ঘেঁষে জনবসতি, কাস্টমস অফিস, জলবিদ্যুৎ নির্মাণ ক্যাম্প এবং বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। অথচ সেখানে বন্যা সহনশীল ব্যবস্থা বা নিরাপত্তার কথা ভাবা হয়নি।
এবার ঘটনাটি ঘটেছে ট্র্যাকিংয়ের মৌসুমে। ফলে স্থানীয়দের পাশাপাশি গোসাইকুণ্ডগামী পর্যটকসহ প্রচুর সংখ্যক দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীর সমাগম ছিল সেখানে, যাদের অনেকেরই সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ বা অতীতে ঘটে যাওয়া বন্যার বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না। সেখানে নিখোঁজের তালিকায় নেপালি ও বিদেশি নাগরিকরাও রয়েছেন। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক আছেন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয়, ২০২৫ সালে একই নদীপথে প্রায় একই ধরনের বন্যা হওয়া সত্ত্বেও সেখানে কার্যকর কোনো সতর্কবার্তা ব্যবস্থা ছিল না। গত বছরের ঘটনার পর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টসহ (আইসিএমওডি) হাইড্রোলজিক্যাল সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীরা ভোটে কোশী ও লেন্দে নদী অঞ্চলকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তারা যেসব মনিটরিং ব্যবস্থার কথা বলেছিল, সেখান থেকে কিছুটা প্রয়োগ করা হলেও তা দ্বিতীয় এই দুর্যোগের আগে নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না।
হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ভেঙে পড়ে বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বরফ দ্রুতগতিতে গলছে এবং প্রাকৃতিক বাঁধ হিসেবে কাজ করা হিমবাহের পলির বাঁধগুলোও ছুটে যাচ্ছে। ফলে এ ধরনের বন্যার প্রবণতা ও তীব্রতা দুটিই বাড়ছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চল বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন, নেপাল, তিব্বত, ভুটান এবং উত্তর ভারতজুড়ে হাজার হাজার হিমবাহ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। অথচ এর বিপরীতে নগণ্য হিমবাহই সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আছে।
হিমবাহে ঝুঁকির বিষয়টি অতীতের তথ্যের ভিত্তিতে চিহ্নিত করতে পারলেও নেপালের প্রতিমুহূর্তের তথ্য পাওয়ার মতো প্রযুক্তি এখনও গড়ে ওঠেনি। সেখানে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা সত্ত্বেও চীন থেকে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়ার কোনো স্থায়ী দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর নদীতীরবর্তী অঞ্চল বা ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহারের উদ্যোগে নেওয়া হয়নি। গত বছরের বিপর্যয়ের পরও কোনো কঠোর নিয়ম কার্যকর করা হয়নি। স্থানীয় পর্যায়ের সতর্কবার্তা, যেমন সাইরেন নেটওয়ার্ক, মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানো বা মানুষদের সরিয়ে নেওয়ার পথ জানা প্রশিক্ষিত স্থানীয় জনসাধারণও নেই। তিমুরে স্যাব রুবেসি এবং ভাটির এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসন সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
কূটনৈতিকভাবে নেপালের উচিত হবে চীনের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত হিমবাহ ও নদী পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্থায়ী তথ্য আদান-প্রদান চুক্তির ওপর জোর দেওয়া। একে কেবল প্রযুক্তিগত বা রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে না দেখে মানবিক ও অবকাঠামোগত সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জলবিদ্যুতের জনশক্তি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বীমা ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করে ঝুঁকি এড়ানোর বিনিয়োগে কাজে লাগবে।
স্থানীয় কমিউনিটিভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি প্রয়োজন। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা, হোটেল ব্যবসায়ী ও ট্র্যাকিং গাইডদের সতর্ক সংকেত শেখানো এবং দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বিনোদ ঢাকাল: নেপালি সাংবাদিক; নেপাল নিউজ ইংলিশ থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক