চারদিক
পরিবেশবান্ধব ইটের সন্ধানে
তালুকদার রিফাত পাশা
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বায়ুদূষণ আমাদের পরিবেশের বড় উদ্বেগের জায়গা। ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস শহরের চারপাশে অবস্থিত ইটভাটা। ঢাকার মোট দূষণের ৫৮ শতাংশ হয়ে থাকে ইটভাটা থেকে। এই দূষণ সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে শীতের সময়। কারণ, ওই সময় ইট পোড়ানোর কাজ করা হয়। এই ইট কেবল যে পরিবেশের জন্য ক্ষতি তাই নয়। এই ইট তৈরির মাধ্যমে আমাদের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপরে হুমকি তৈরি করছে। কারণ, ইট তৈরি করতে যে মাটি নেওয়া হয়, সেটি হচ্ছে জমির টপ সোয়েল বা মাটির উপরি অংশ, যা অত্যন্ত উর্বর ও পুষ্টিসমৃদ্ধ। আবার এর ধোঁয়া আশপাশের পরিবেশ দূষণ করে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়।
ইটভাটা যে আমাদের পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে এ বিষয় নিয়ে দেশি-বিদেশি অনেক সংস্থা–এমনকি সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তরও গবেষণা করেছে। আজ পর্যন্ত আমরা ঢাকার নগরবাসী তেমন কোনো সুফল পেলাম না। আবার সরকার (ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩) প্রণয়ন করেছে। কিন্তু হায়, তার কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না!
আমরা পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের কথা জানি। যদিও ব্লক ইট তৈরিতে ব্যবহৃত সিমেন্ট থেকেও কার্বন নির্গত হয়, তবুও এটি তুলনামূলকভাবে কম দূষণকারী। এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। প্রশ্ন হলো, উৎপাদনের সেই খরচ কি আমাদের শিশুদের ফুসফুসের চেয়ে বেশি?
ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে যখনই আলোচনা আসে, তখনই কয়েকটি বিষয় খুব জোরেশোরে বলা হয়, মেয়াদ উত্তীর্ণ লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি ঢাকার বায়ুকে দূষিত করে চলছে। আবার ঢাকার ভেতরে নির্মাণকাজের মাধ্যমেও অনেক দূষণ হচ্ছে। সুতরাং এসব বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকার চারপাশের ইটভাটা জালের মতো ছড়িয়ে আছে। পরিবেশ দূষণকারী এই ইটভাটা বন্ধ করার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, সরকারি নির্মাণকাজে পরিবেশবান্ধব ইট, বিশেষ করে ব্লক ইট ব্যবহার শুরু করা হবে। ২০২৫ সালের মাঝে সব স্থাপনায় এই ইট ব্যবহার করা হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা ব্লক ইট ব্যবহার বাড়নোর লক্ষ্য নিয়ে সব অংশীজনের সঙ্গে মিটিং করেছেন কিন্তু তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। এখন আমাদের নির্বাচিত সরকার আছে। তারা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। এই মেয়াদকালের মাঝে ঢাকার চারপাশের দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ করে তাদের পরিবেশবান্ধব ইট তৈরিতে নিয়ে আসতে হবে। এটি করার ক্ষেত্রে সরকার যে কাজটি করতে পারে সেটি হচ্ছে, ২০১৯ সালের সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে যে, ব্যক্তিগত বা বেসরকারি পর্যায়ে যারা কোনো স্থাপনা নির্মাণ করবেন তাদের অবশ্যই ব্লক ইট অথবা পরিবেশবান্ধব ইট ব্যবহার করতে হবে। নতুবা কোনো অনুমোদন দেওয়া হবে না।
ঢাকা তথা সমগ্র দেশকে বিষাক্ত বায়ু ও কৃষিজমির বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে পরিবেশবান্ধব ইটের বিকল্প নেই। আইন ও নীতিমালার কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এখন প্রয়োজন কার্যকর ও কঠোর বাস্তবায়ন। সাময়িকভাবে ব্লক ইটের খরচ বেশি মনে হলেও, আমাদের জনস্বাস্থ্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফুসফুসের সুরক্ষা এবং কৃষির উর্বরতা রক্ষার তুলনায় সেই খরচ নিতান্তই সামান্য। সরকার, রাজউক এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপে যদি পরিবেশবান্ধব ইট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যায়, তবেই কেবল আমরা বাসযোগ্য ও দূষণমুক্ত পরিবেশের আশা করতে পারি।
তালুকদার রিফাত পাশা: অ্যাডভোকেসি অফিসার ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং বাংলাদেশ
[email protected]
- বিষয় :
- চারদিক