প্রতিবেশী
নেপাল ট্র্যাজেডি এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সমন্বিত দায়িত্ব
হিমালয়ের হিমবাহের বরফ ও শিলা ভেঙে আকস্মিক বিধ্বংসী বন্যায় নেপাল ও তিব্বতে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে
রঞ্জন দত্ত ও জেবুন্নেসা চপলা
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৪৩
নেপাল ও তিব্বতে এবারের ভয়ানক বন্যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে– দুর্যোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ঘটে না। হিমালয়ের হিমবাহের বরফ ও শিলা ভেঙে আকস্মিক বিধ্বংসী বন্যার ফলে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে; অনেক মানুষ নিখোঁজ। অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত। নিহতদের মধ্যে স্থানীয় নেপালিদের পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকে আসা পর্যটকরাও রয়েছেন। তবে এই অঘটনে কেবল প্রাকৃতিক কারণের ওপর নজর দিলে অনেক কিছু আড়ালে থেকে যেতে পারে।
দুর্যোগের পরিণতি কারা ভোগ করে এবং ঝুঁকি দূর করার দায়িত্বই বা কার– আমাদের সাম্প্রতিক প্রকাশিত গবেষণায় এই প্রশ্নগুলোই প্রধান বিবেচ্য ছিল। গবেষণাটি ছিল কাঠমান্ডুর কমিউনিটি নেতৃত্বাধীন ভূমিকম্প প্রস্তুতির ওপর।
বিপদ কেটে গেলেই দুর্যোগ শেষ হয়ে যায় না
২০১৫ সালে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই দুর্যোগের ক্ষত এখনও কাটেনি, যার কথা বলেছেন সেখানকার স্থানীয়রা। তারা দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, অসম্পূর্ণ আবাসন, পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়া, জীবিকার অনিশ্চয়তা, মানসিক আঘাত এবং অপর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার কথা তুলে ধরেছেন।
তাদের এই অভিজ্ঞতা পুনর্বাসন সম্পর্কিত প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। কেবল ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট ঠিক করলেই কমিউনিটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, বলা যায় না। পানি, জীবিকা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক সম্পর্ক, পরিবেশগত অবস্থা, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা; সবই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। এর যে কোনো একটি সংকটে পড়লে তার নেতিবাচক প্রভাব অন্যান্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ঠিক এই কারণেই বর্তমান ট্র্যাজেডি এত বেশি উদ্বেগজনক।
আমরা দিন দিন এমন এক বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি, যেখানে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত চাপ, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি, পানির অনিশ্চয়তা, দুর্বল অবকাঠামো, সামাজিক বৈষম্য এবং শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতাগুলো আলাদাভাবে না ঘটে বরং একে অপরকে প্রভাবিত ও তীব্রতর করছে। এই অঘটনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ ঠিক কতখানি ছিল, তা বিজ্ঞানীদের নির্দিষ্ট করতে হবে। প্রতিটি বন্যা বা ভূমিধসকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘জলবায়ু দুর্যোগ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা থেকে আমাদের বিরত থাকা উচিত। তা সত্ত্বেও হিমালয় অঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগের। হিমবাহ গলে যাওয়া, তুষারপাতের পরিবর্তন, পারমাফ্রস্ট বা চিরহিমায়িত মাটির ক্ষয় এবং নদনদীর গতিপথের পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় নতুন নতুন দুর্যোগের ঝুঁকি তৈরি করছে।
কমিউনিটিগুলো উদ্ধারের অপেক্ষায় বসে নেই
নেপালের ভূমিকম্প সম্পর্কিত আমাদের গবেষণা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: দুর্যোগাক্রান্ত সাধারণ মানুষকে কেবল বাইরের কারও এসে উদ্ধার করার অপেক্ষায় থাকা অসহায় জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখা উচিত নয়। স্থানীয় মানুষ নিজেদের দুর্যোগ প্রস্তুতির বিষয়ে নিজেরাই চিহ্নিত করেছেন– সময়োচিত তথ্য, স্থানীয় পর্যায়ে আয়োজিত প্রশিক্ষণ, স্থানীয় দুর্যোগ মোকাবিলার দল এবং নারীদের শক্তিশালী ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্যোগের পর শুধু যত্নকারী হিসেবে নয়; নারীদের ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় মানুষকে প্রস্তুত করার কাজের শিক্ষক ও নেতৃত্ব দানকারী হিসেবেও সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। এই পর্যবেক্ষণ অন্যান্য গবেষণার ফলের সঙ্গেই মিলে যায়। আদিবাসী, স্থানীয় কমিউনিটি ও নারী নেতৃত্বাধীন জলবায়ু সমাধানের ওপর গবেষণা দেখায়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে এমন জ্ঞান ও প্রশাসনিক দক্ষতা রয়েছে, যা প্রথাগত দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থাগুলো প্রায়ই নজর এড়িয়ে যায়।
কাজেই সমস্যাটি স্থানীয় জ্ঞানের অভাব নয়। বরং সরকার, মানবিক সাহায্যকারী সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় মানুষের মতামত নিলেও তাদের সেই জ্ঞান কীভাবে প্রস্তুতি, অর্থায়নের অগ্রাধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষকে কোনো কার্যকর ক্ষমতা দেয় না।
নেপালের দুর্যোগ বিশ্বের জন্য সতর্কতা
নেপালের এই বিপর্যয় কেবল নেপালের একার জন্য সতর্কবার্তা নয়। উদাহরণস্বরূপ, কানাডায়ও দেখা যাচ্ছে দাবানল, বন্যা, তীব্র তাপদাহ, পানির সংকট, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং বাস্তুচ্যুতির মতো জটিল সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় আমরা পেয়েছি, স্থানীয় ভূমিভিত্তিক জ্ঞান কীভাবে দুর্যোগ অভিযোজনের পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় কমিউনিটি নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা প্রমাণ করে, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বা রেজিলিয়েন্স কেবল প্রযুক্তির ওপর নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্তৃত্ব, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং নিজস্ব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ওপরেও নির্ভর করে।
রঞ্জন দত্ত ও জেবুন্নেসা চপলা: যথাক্রমে কানাডার মাউন্ট রয়্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির আর্থ, এনার্জি ও এনভায়রনমেন্ট বিভাগের পোস্ট ডক্টরাল ফেলো; দ্য কনভার্সেশন থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক