ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

জ্বালানি প্রশ্নে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

জ্বালানি প্রশ্নে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে
×

মারুফ মল্লিক

মারুফ মল্লিক

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৯ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশ জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ নেই। একসময় প্রচার করা হতো– ‘দেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে’। এখন নিয়মিত গ্যাসই পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, সংকট নিরসনে সময় লাগবে। আমরা কেন এ পরিস্থিতিতে উপনীত হলাম? উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে না চাপিয়ে প্রকৃত সংকট কোথায়– খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা যে কোনো দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চিত ও নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য। 

মনে রাখা জরুরি, কঠিন সংকটময় সময়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার অর্থনীতিকে ফোকলা করে দিয়ে পালিয়েছে। সীমাহীন দুর্নীতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়েছে। লুটপাট, ভঙ্গুর ও স্থবির অর্থনীতিকে সচল করার দায়িত্ব বর্তেছে বিএনপি সরকারের ওপর।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতিবেদন প্রণয়নকালীন বাজারদরে এর পরিমাণ ছিল ২৮ লাখ কোটি টাকা (সমকাল, ২ ডিসেম্বর ২০২৪)। 

আমাদের দুর্বল ও ছোট আকারের অর্থনীতির জন্য এটা বিশাল ধাক্কা। আরও ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা। দুর্নীতি রোধ করতে গিয়ে অর্থনীতিকেই স্থবির করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে; সরকারকে একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে, আরেকদিকে আন্তর্জাতিক সংকটের ঘানিও টানতে হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সময়সাপেক্ষ এবং সহজসাধ্য কর্ম না। এ জন্য লাগবে সময়, সময়োপযোগী নীতি ও ধৈর্য। স্বল্প মেয়াদের নীতিতে সাময়িক কিছু সমস্যার সমাধান করা যাবে; দীর্ঘমেয়াদি নীতি ছাড়া টেকসই সুফল পাওয়া যাবে না। 
আওয়ামী লীগ সরকারের অনিয়ম ও অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার ফল আমরা ভোগ করছি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে। আওয়ামী লীগের আমলে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এটা ছিল জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ও উচ্চমূল্যের। সুপরিকল্পিত উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো হয়নি। ভারতীয় কোম্পানি আদানি থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। সবাই যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন কয়লা ও গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। অথচ ভারত ও পাকিস্তান ঠিকই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এগিয়ে গেছে। পাকিস্তানে ৬৪ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। যে কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ভারত ও পাকিস্তানকে খুব বেশি বিপাকে ফেলতে পারেনি।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে বিশেষ কিছু করা হয়নি। বরং ৩১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ বাতিল করা হয়েছে। ঠিক আছে– আওয়ামী লীগ ওই টার্মিনাল স্থাপনে দুর্নীতি করেছে। তাই বলে প্রকল্প বাতিল করতে হবে? পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুনভাবে টার্মিনাল স্থাপন বা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়া যেত। 

একদিকে আওয়ামী লীগের অনিয়ম, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের অদূরদর্শিতার পর বিএনপি সরকারকে এখন দেশকে অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলতে হচ্ছে। সম্ভবত সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা প্রকাশ করবেন। এতে জ্বালানি সংকট সমাধানের স্থায়ী ও টেকসই প্রস্তাবনা থাকতে পারে।
এখনকার মূল সংকট হচ্ছে গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। আমাদের গ্যাস আমদানি পুরোপুরি হরমুজ প্রণালিনির্ভর। কিন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে প্রণালিটি বন্ধ। এলএনজি আমদানির জন্য কাতার ও ওমানের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের। কাতারের বেশ কিছু গ্যাসক্ষেত্র ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখান থেকে আগের মতো সরবরাহ মিলছে না। শুধু বাংলাদেশ নয়; অন্যান্য ক্রেতাও কাতার থেকে গ্যাস পাচ্ছে না।

বাংলাদেশ চাইলেও এখন অন্য দেশ থেকে জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস আমদানি করতে পারছে না। বিক্রেতা দেশগুলো দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তিতে থাকা দেশগুলোকেই গ্যাস সরবরাহ করছে। নতুন চুক্তিও সময়সাপেক্ষ। এর বিকল্প ‘স্পট মার্কেট’ থেকে ক্রয়। সে ক্ষেত্রে দামের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। স্পট মার্কেটে এখন প্রতি ইউনিট গ্যাস ২২-২৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহেও ছিল ১২-১৫ ডলার; আগামী সপ্তাহে ৩০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থায় ছেদের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এ মূল্য কোথায় গিয়ে থামবে, বলা মুশকিল।
বর্তমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে আমাদের জ্বালানি নীতি প্রণয়নে অদূরদর্শিতা। সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু জ্বালানি সংকটের সমধান হয় না। স্বল্প মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এ সংকটের সমাধান হবে না। উচ্চমূল্যে জ্বালানি সরবরাহও নিরাপদ জ্বালানি নিশ্চিত করে না। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের জ্বালানি খাত গভীর চক্রে আটকে আছে; উত্তরণের পথ খোঁজা হয়নি। সাময়িক সমাধানের নামে জ্বালানি ব্যয় বাড়ানো হয়েছে; মানুষের ব্যয় বেড়েছে। 

এ অবস্থায় আমাদের ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য স্থায়ী ও টেকসই সমাধান বের করতে হবে। আপাতত জ্বালানি সংগ্রহ করে সাময়িক সমাধান করে দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার।

পাশাপাশি সরকারকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সংকটের সমাধান করতে হবে। কারণ জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তার সঙ্গে ভূ-রাজনীতিও গভীরভাবে যুক্ত। তাই খুব বেশি আমলা ও বিশেষজ্ঞনির্ভর না হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই নিতে হবে।

ড. মারুফ মল্লিক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×