ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জনস্বাস্থ্য

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চাই ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চাই ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’
×

মুশতাক হোসেন

মুশতাক হোসেন

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ধীরে ধীরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে– এ কথা আমরা অনেক আগে থেকেই বলে এসেছি। তার প্রতিফলন হলো বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন, যেখানে বলা হয়েছে, এ বছর মাস হিসেবে আগস্টে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যু ঘটেছে। বস্তুত কয়েক বছর ধরেই নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ আমরা দেখছি। সাধারণত অক্টোবরে প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সতর্কতা থাকলেও সমাধানের জন্য সরকার গতানুগতিক পথেই হেঁটেছে। গতানুগতিক পদ্ধতিতে মশা মারার কার্যক্রম চলছে। রাসায়নিকের ধোঁয়া প্রয়োগ হচ্ছে কেবল ঢাকা শহরের কয়েকটা জায়গায়। আমরা বারবার বলেছি, এই গতানুগতিক পন্থায় মশা নিয়ন্ত্রণ বা ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু কমানো যাবে না। একটা জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনা করে সমন্বিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা দরকার, যেখানে প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর মনোনীত একজন সিনিয়র মন্ত্রী সমন্বয়ের কাজটা করবেন। কিন্তু জরুরি অবস্থা বিবেচনায় ক্রাশ প্রোগ্রামের পথে সরকার হাঁটেনি। আমরা আগের সরকারের আমলেও বলেছি, তারা বিরক্ত হয়েছে; এই সরকারও বিরক্ত হচ্ছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

অথচ এ ধরনের জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার উদাহরণ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের কলকাতাতেই আছে। নেপাল-মালদ্বীপও ক্রাশ প্রোগ্রামের ভিত্তিতে মশা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। হামের বিষয়েও বলেছি, আমাদের চিকিৎসা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত।

প্রাথমিক পর্যায়ে ডেঙ্গু রোগ শনাক্ত করার জোরালো ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। সরকার বিনামূল্যে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে, এটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এর প্রচার কম। অনেকে জানেও না। এমন দরিদ্র মানুষ থাকাও অস্বাভাবিক নয়, যারা খরচের ভয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে হাসপাতালে যেতে চায় না। অনেকে বাধ্য হয়ে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে যায় বটে; ইতোমধ্যে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়। সে জন্য মানুষের দোরগোড়ায় ডেঙ্গু পরীক্ষার সেবা পৌঁছানো দরকার। ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি গাড়ি মানুষের কাছে পৌঁছালে এর সুফল পাওয়া সম্ভব হতো।
কারও দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে সেটি ভয়ানক হতে পারে। শ্রমজীবী মানুষ হয়তো জ্বর সেরে গেলেই কাজে চলে যান। রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক তথা শারীরিক পরিশ্রম করেন, এমন কেউ কেউ কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন। শেষ মুহূর্তে স্থানীয় হাসপাতালে নিলে কর্তৃপক্ষ ‘আইসিউ নেই’ বলে সোজা ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু রোগীর পরিস্থিতি এই পর্যায়ে হয়তো পৌঁছাতো না যদি তৃণমূলে সহজে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকত।

আগেও বলেছি, আমাদের চিকিৎসা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত। সব হচ্ছে বড় বড় হাসপাতালকেন্দ্রিক। সেখানে আইসিইউ, অক্সিজেন, ভেন্টিলেটরের দিকে মনোযোগ। আর মশা নিয়ন্ত্রণে কেবল রাসায়নিক ধোঁয়া প্রয়োগ করা হয়। কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এভাবে আমাদের সিটি করপোরেশনের কর্মীদের যত ঘামই ঝরুক, মশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
হিসাব বলছে, আগস্ট মাসে ২০ হাজার ৫৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। যখন খারাপ রোগীরা শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসেন, তখন রাস্তায়ই অনেকে মারা যান। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনায় উন্নতি ঘটলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। এখন সেপ্টেম্বর চলছে। অক্টোবর ও নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। 

চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে পরিবারগুলো সংকটে পড়ে। সেদিকেও দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
সম্প্রতি প্রকাশিত হাম নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শিশুর হামের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ৮৯ শতাংশ পরিবারই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে; সঞ্চয় শেষ হয়েছে ৬১ শতাংশ পরিবারের। অনেক পরিবারকে জমিজমাও বিক্রি করতে হয়েছে। এ বছর হামে যারা মারা গেছে, তাদের অধিকাংশই নিম্নআয়ের পরিবারভুক্ত। হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে সেটি আরও সংকটপূর্ণ হবে। আইসিইউর খরচ এত বেশি যে, দরিদ্র মানুষের পক্ষে তা কোনোভাবে বহন করা সম্ভব নয়। সে জন্য তারা সরকারি হাসপাতালে আইসিউর জন্য অপেক্ষা করে। হামের ক্ষেত্রে এমনকি দেখা গেছে, আইসিইউর অপেক্ষায় থাকতে গিয়ে শিশুর মৃত্যুই ঘটে গেছে।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি যদিও বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ সেবা নেয়; তাদেরও পরিবারের ঋণ অনেক বেড়ে যায়। সে জন্য বিশেষ করে যারা দরিদ্র বা নিম্নবিত্তের, তাদেরকে অবশ্যই সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা অত্যন্ত অপ্রতুল। যা পাওয়া যায়, তা-ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেক সময় লেগে যায়। দরিদ্র রোগীরা যেন তৎক্ষণাৎ সহযোগিতা পান, তা নিশ্চিত করা দরকার। আইসিইউতে গেলে রোগীর অনেক ওষুধের প্রয়োজন হয়। এমন হতে পারে তৎক্ষণাৎ সরকারি ব্যবস্থাপনায় ওষুধের ব্যবস্থা করা যেতে পারে অথবা দ্রুততম সময়ের মধ্যে অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা। যেটাই হোক, একটা রোগীবান্ধর নীতির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে সহযোগিতা পেতে পেতে রোগী মরে না যান।
ভিআইপি, ভিভিআইপিদের সরকারি টাকায় চিকিৎসায় হয়। এ বাবদ লাখ লাখ টাকা তারা বিদেশে চিকিৎসা করতে গিয়ে খরচ করেন। সাধারণ মানুষ কেন সরকারি সহযোগিতা পাবেন না? প্রতিটি হাসপাতালে সমাজকল্যাণ বিভাগের জনবল থাকে। তাদের মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগী বিশেষ করে দরিদ্রদের চিকিৎসায় অর্থসংস্থান করা উচিত। আমরা ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসায় দেখেছি, প্রথমদিকে তাদের চিকিৎসা খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল; পরে কিছুটা উন্নত হয়েছে।

হাম কিংবা মহামারির মতো রোগের চিকিৎসা সরকারকে প্রাধান্য দিয়ে করতে হবে। এগুলো জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি। নাগরিক হিসেবে তাদের সারিয়ে তোলার দায়িত্ব সরকারের; সেটা যেমন আন্তর্জাতিক আইনে, তেমনি বাংলাদেশের আইনেও আছে। চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে মধ্যবিত্ত হয়ে যাচ্ছে নিম্নবিত্ত, আবার নিম্নবিত্ত দরিদ্রের কাতারে পৌঁছে যাচ্ছে। তাদের চিকিৎসা ব্যয় সরকারের বহন করা উচিত। অন্তত জরুরি পরিস্থিতিতে তারা ঋণ পেলে তাদের কিছুটা স্বস্তি মিলবে।

সবচেয়ে বড় কথা, আইসিইউতে যাতে রোগীকে নেওয়া না লাগে, সে জন্য আগেই ব্যবস্থা করা চাই। অর্থাৎ ডেঙ্গু প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়ার পরই চিকিৎসা গ্রহণ এবং ডেঙ্গু সহজে শনাক্তকরণে জোর দেওয়া। 

আগস্টে যেভাবে ডেঙ্গু সংক্রমণ বেড়েছে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কার কারণে সরকারের প্রস্তুতি জরুরি। মশা নিধনে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসার বিষয়ও থাকতে হবে অগ্রাধিকারে।
 
ডা. মুশতাক হোসেন: রোগতত্ত্ববিদ; সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও
গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)
 

আরও পড়ুন

×