ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

দিবস

শিক্ষকের সম্মান মুখে নয়, নীতিতে চাই

শিক্ষকের সম্মান মুখে নয়, নীতিতে চাই
×

মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ

মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৫

প্রতিবছর ৫ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৬৬ সালের এই দিনে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনেস্কো যৌথভাবে ‘শিক্ষকদের মর্যাদাবিষয়ক সুপারিশমালা’ গ্রহণ করে। পরে ১৯৯৭ সালে উচ্চশিক্ষার শিক্ষকদের জন্য আলাদা সুপারিশমালা যুক্ত হয়। ২০২৬ সালে সেই ঐতিহাসিক দলিল ৬০ বছর পূর্ণ করছে। তাই এবারের প্রতিপাদ্যে শিক্ষকের পেশার সুরক্ষা দেওয়া, তাঁর মর্যাদা এগিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাঁর ভূমিকা স্বীকার করার বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউনেস্কো শিক্ষকের মর্যাদাকে শুধু সামাজিক সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখছে না। এর সঙ্গে যুক্ত করছে শিক্ষকের পেশাগত স্বাধীনতা, নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণ, পেশাগত সহায়তা, বেতন, কর্মঘণ্টা ও কর্মপরিবেশের প্রশ্ন। ছয় দশক পূর্তির এই শিক্ষক দিবসে তাই আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা দরকার: সেই অঙ্গীকার বাংলাদেশে কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?

শিক্ষকতা পেশা এখন সারাবিশ্বেই সংকটে। ইউনেস্কোর ২০২৪ সালের বৈশ্বিক শিক্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বে আরও প্রায় চার কোটি ৪০ লাখ শিক্ষক প্রয়োজন। একই বছর শিক্ষকতা পেশা নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের উচ্চ পর্যায়ের প্যানেল কিছু সুপারিশ দিয়েছে। সেগুলোর কেন্দ্রে আছে প্রতিযোগিতামূলক বেতন, পেশাগত মর্যাদা এবং নীতি নির্ধারণে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ। বিশ্ব এখন মেনে নিচ্ছে যে শুধু ভবন, পাঠ্যবই বা প্রযুক্তি দিয়ে শিক্ষার মান বাড়ানো যায় না। শিক্ষার মান কখনও শিক্ষকের মানকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না।

শিক্ষায় সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা একই কথা বলে। ফিনল্যান্ডে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে আবেদনকারীদের মধ্যে সাধারণত ১০ শতাংশের মতো সুযোগ পান। সেখানে শিক্ষকতা চিকিৎসা বা আইনের মতোই সম্মানজনক পেশা। দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে স্নাতকদের শীর্ষ ৫ শতাংশ থেকে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ হয়ে আসছে। সিঙ্গাপুর শীর্ষ এক-তৃতীয়াংশ স্নাতকের মধ্য থেকে শিক্ষক বাছাই করে এবং প্রশিক্ষণের সময়ে তাদের বেতন দেয়। এসব দেশ শিক্ষককে আবেগ দিয়ে নয়; নীতি, বেতন কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দিয়ে সম্মান করেছে। বিনিময়ে তারা পেয়েছে দক্ষ মানবসম্পদ, উদ্ভাবনী অর্থনীতি ও স্থিতিশীল সমাজ।

বাংলাদেশের চিত্র এর বিপরীত। আমরা মুখে শিক্ষককে ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ বলি, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক অবস্থানে তাদের রাখি পেছনের সারিতে। শিক্ষা খাতে আমাদের সরকারি ব্যয় দীর্ঘদিন জিডিপির ২ শতাংশের নিচে। অথচ ইউনেস্কোর সুপারিশ হলো জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ, অথবা মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়াতেও আমাদের এই হার সর্বনিম্নের কাতারে। শিক্ষায় বিনিয়োগ কম হলে তার সবচেয়ে বড় ভার পড়ে শিক্ষকের বেতন ও কর্মপরিবেশের ওপর।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা এখনও তুলনামূলক নিম্ন গ্রেডে চাকরি শুরু করেন। একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে যারা প্রশাসন, পুলিশ বা অন্য ক্যাডারে যোগ দেন, তাদের বেতন, পদোন্নতি, যানবাহন, আবাসন, প্রশিক্ষণ ও বিদেশ সফরের সুযোগের সঙ্গে শিক্ষকের তুলনা করলে বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা আবাসন, চিকিৎসা, রেশন ও অবসরকালীন সুবিধা পান। এসব সুবিধা রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই দেওয়া হয়। কিন্তু জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাদের হাতে গড়ে ওঠে, তাদের প্রয়োজন কি কম গুরুত্বপূর্ণ?

বৈষম্য শুধু অন্য পেশার সঙ্গে নয়, শিক্ষক সমাজের ভেতরেও গভীর। দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বড় অংশ চলে বেসরকারি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে, যেখানে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কাজ করেন। একই পাঠ্যক্রম, একই পরীক্ষা ও একই দায়িত্ব পালন করেও তারা সরকারি শিক্ষকদের সমান সুবিধা পান না। বছরের পর বছর তাদের বাড়ি ভাড়া ভাতা ছিল মাত্র এক হাজার টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা। উৎসব ভাতা ছিল মূল বেতনের একটি অংশমাত্র। সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর কিছু ভাতা বাড়ানো হয়েছে, তবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় তা এখনও অপ্রতুল। নন-এমপিও শিক্ষকদের অবস্থা আরও করুণ। তাদের অনেকে বছরের পর বছর প্রায় বিনা বেতনে পড়িয়ে যাচ্ছেন।

সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার শিক্ষকদের মধ্যেও সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদায় পার্থক্য রয়েছে। কারিগরি শিক্ষাকে আমরা দক্ষ জনশক্তি তৈরির হাতিয়ার বলি। অথচ সেখানে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের ঘাটতি প্রকট। কারণ শিল্প খাত তাদের অনেক বেশি পারিশ্রমিক দেয়। মাদ্রাসার শিক্ষকরা আধুনিক বিষয় পড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কম পান। বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষকদের মধ্যেও রয়েছে স্পষ্ট বিভাজন। উচ্চশিক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন, গবেষণা অনুদান ও চাকরির নিরাপত্তায় বড় ফারাক বিদ্যমান। এমনকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম বেতন পান। ফলে মেধাবী গবেষকরা বিদেশমুখী হচ্ছেন।

এই বৈষম্যের ফল আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের খুব কমই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন। অনেকে শিক্ষকতায় আসেন অন্য চাকরি না পেয়ে, কিংবা অন্য চাকরির প্রস্তুতির ফাঁকে সাময়িক আশ্রয় হিসেবে। জীবিকার তাগিদে বহু শিক্ষক প্রাইভেট ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এতে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা দুর্বল হয় এবং অভিভাবকের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়ে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ শ্রেণি-উপযোগী ভাষা ও গণিতের দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। দায় এককভাবে শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের নয়। দায় সেই ব্যবস্থার, যা মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে পারেনি।

২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে সব স্তরের শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর সুপারিশ করা হয়েছিল। দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষকের পেছনে ব্যয় কোনো খরচ নয়, এটি সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ। শিক্ষক দিবসে ফুলেল শুভেচ্ছা আর আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা যথেষ্ট নয়। শিক্ষকরা করুণা চান না। তারা চান ন্যায্য মর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতি। ইউনেস্কো এবার বলছে ‘শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো’র কথা। সেই পাশে দাঁড়ানো তখনই অর্থবহ হবে, যখন একজন মেধাবী তরুণ গর্বের সঙ্গে বলবেন– ‘আমি শিক্ষক হতে চাই’। এতে তাঁর পরিবারও তাতে গর্ববোধ করবে। সেই দিনটি আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, নীতিনির্ধারকদের এবং আমাদের সবার।

ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ: অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরামর্শক, হিট প্রকল্প, ইউজিসি

আরও পড়ুন

×