সমকালীন প্রসঙ্গ
পুলিশ ভেরিফিকেশনের ভেরিফিকেশন
আকম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
আকম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৭
স্কুলবন্ধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা একদিন অফিসে উপস্থিত। সেই সময়ে তিনি ভিন্নমতের রাজনীতিতে জড়িত; দলের জেলা শাখার নেতা। পেশায় আইনজীবী। আগমনের হেতু– তাঁর পুত্রবধূ বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগপত্র পাননি। গেলাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। যেয়ে শুনি, পুলিশের বিরূপ মন্তব্যের কারণে নিয়োগপত্র জারি হয়নি। এমন অনেকেরই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাদের পুনঃ ভেরিফিকেশনের জন্য পাঠাবে। বন্ধুর বেয়াই ধার্মিক মানুষ। ব্যাংকার ছিলেন। তখন অবসরে। তিন মেয়ে।
বন্ধুপুত্রবধূ মেজো, চিকিৎসক। ভেরিফিকেশনের জন্য কর্মকর্তা যখন বাড়ির সামনে বাইক থেকে নামছিলেন তখন এশার আজান পড়ছে। বেয়াই সাহেবের সঙ্গে কর্মকর্তার দেখা। বেয়াই সাহেব পরিচয় দিয়ে বাড়ি দেখিয়ে দিলেন এবং কর্মকর্তাকে দস্তুরমতো রাহা খরচ বাবদ কিছু টাকা হাদিয়া দিয়ে মসজিদে চলে গেলেন। কর্মকর্তা বাসায় যেয়ে পুত্রবধূর সনদপত্ররাজি দেখলেন, জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। ড্রয়িংরুমে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের বলে কথিত এক দৈনিক পত্রিকা ছিল। কর্মকর্তা ঠাহর করে নিলেন, এই পরিবার ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের। বিরূপ প্রতিবেদন দিলেন। ভাগ্যিস, বন্ধুর একজন সহযোদ্ধা তখন একটি গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পদে। তাই দ্বিতীয়বারের ভেরিফিকেশনে উৎরে গিয়ে আমাদের সেই চিকিৎসক এখন সহকারী অধ্যাপক।
পুলিশ ভেরিফিকেশন রোলে সাধারণত নাম ও পরিচয়, ঠিকানা, ঠিকানার সত্যতা, শিক্ষাগত তথ্য, মামলা (কোনো ফৌজদারি মামলা আছে/ছিল কিনা), গ্রেপ্তার/অভিযোগ, দণ্ডাদেশ, অপরাধমূলক কার্যকলাপ, চরিত্র ও সুনাম, ভেরিফিকেশন ফরমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন বা ভুল দেওয়া হয়েছে কিনা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হয়ে থাকে। তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার মনমানসিকতাও প্রতিবেদনে প্রভাব ফেলে।
পুলিশ কর্মকর্তার মানসিক সহমর্মিতা থাকাতেই হয়তো অপ্রত্যাশিত অনেকে বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন। ১৯৮৩-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী অন্তত একডজন ছাত্রনেতা সে বছর এবং পরেও বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডার পদে নিয়োগ লাভ করেছিলেন। নিয়োগ পাওয়া সেই কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের সারথি হয়েছেন। গণতন্ত্রে শত মতের সন্নিবেশ ঘটে। অথচ কেন যেন মানুষ ভাবতে শুরু করেছে– গণতন্ত্রের বলি হচ্ছেন ভিন্নমতের চাকরিপ্রার্থী, ভিন্নমতের চাকরিজীবী। ফলে সমাজের ভেতর ‘আমরা’ আর ‘ওরা’র বিরোধ তীব্র হচ্ছে। আমরা আর ওরা মিলে ‘আমরা সবাই’ হতে পারছি না। আর তা না হতে পারলে বিচ্ছিন্নভাবে কারও কারও লাভ হলেও সামগ্রিকভাবে ক্ষতি রাষ্ট্রের।
ক্যাডার পদ থেকে এখন এই ‘আমরা’ ‘ওরা’ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদেও সংক্রমিত। মেধা তালিকায় উপজেলায় প্রথম, দ্বিতীয় হয়েও তামান্না আক্তার, বন্যা মল্লিকরা ছিটকে যান। বিপুল সংখ্যক, বিভিন্ন ভাষ্যমতে ৮১৭ থেকে ১৫০০+ চাকরিপ্রার্থী বাদ পড়ে গেছেন পুলিশ ভেরিফিকেশনের দোহাইতে। মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় মিশন আচার্য নিয়োগপত্র পান না। মিশন আচার্যের কথায় মনে পড়ছে ১৯০৬ সালের এক সত্য ঘটনা নিয়ে জার্মান নাট্যকার কার্ল জুকমায়ারের ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’ নাটকের কথা। জেল খেটে বেরিয়ে ভিলহেল্ম ফয়ট কোনো কাজ পান না পরিচয়পত্রের অভাবে। আবার পরিচয়পত্র পান না কাজ না থাকায়। এই যে এটা না হলে ওটা হবে না; ওটা না থাকলে এটা হবে না– এই টানাপোড়েনে একদিন হঠাৎ ভিলহেল্ম ফয়ট জোগাড় করে ফেলেন এক ক্যাপ্টেনের পোশাক; হয়ে যান নকল ক্যাপ্টেন। গ্রেপ্তার করেন নগরীর মেয়রকে। পরে অবশ্য নিজেই আটকে যান ফাটকে। একটা কাজ পেলে তিনি ওই প্রতারণার হোতা হতেন না। সেদিন ফয়টকে উদ্ধার করতে কেউ না এগোলেও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান দায়িত্ব নিয়েছেন মিশনের নিয়োগপত্র জারির। সবার পেছনে এমন করে একেকজন ঢাল হয়ে দাঁড়ালে বাকিরাও হয়তো নিয়োগপত্র পাবেন। তা না হলে ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ প্রলাপ বকতে বকতে আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার চাওয়া ছাড়া কিছু করার থাকবে না।

বলছি না– পুলিশ ভেরিফিকেশনের দরকার নেই। পুলিশ প্রথমত তদন্ত করে দেখবে ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক কিনা! মিশন আচার্যের নিজের বাড়ি নেই। বাংলাদেশে এমন অনেক মানুষই আছেন, যাদের নিজের বাড়ি নেই। অনেকেই কাজের সূত্রে নিজ জেলার বাইরে দূরে কোথায়ও গেলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান শিকড় থেকে। তাঁর সন্তানরাও কাজের সূত্রে ছুটেছেন অন্য লোকালয়ে। তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্ম চেনে না পূর্বপুরুষের ভিটা। শুধু মুখেই বলে স্থায়ী ঠিকানা কোনো জেলার কোনো গ্রামে। অনেক পুরুষ মানুষ দূরে কোথাও বিয়ে করে সন্তান হওয়ার পর নিরুদ্দেশ হলে সন্তানরা হয়ে যান ঠিকানাহীন। নদীভাঙন, ভিটা বিক্রি অথবা যোগাযোগের অভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের পরবর্তী প্রজন্ম ভাড়া বাড়ি অথবা পরের জমিতে বাস করে টিকে আছেন। মিশন আচার্য হতে পারতেন অনেকের রোল মডেল। এখনও হলেন, তবে নেতিবাচকভাবে। বাস্তুহীন মানুষ কি তাহলে আর পড়াশোনা করবেন না? তারা কি চাকরির বাজারে লড়বেন না? নাকি তারা শৈশব থেকেই সমাজ-বিচ্ছিন্ন, সমাজবিরোধী হওয়ার পথে এগোবেন অথবা দেশান্তরী হবেন? রাষ্ট্র কি তাদের সেই পরামর্শই দিল মিশন আচার্যের মাধ্যমে?
চাকরিপ্রার্থী কোনো ফৌজদারি মামলায় দুই বছরের বেশি মেয়াদে দণ্ডিত কিনা– যাচাই করে দেখবে পুলিশ। যদি দণ্ডিত না হন; ব্যক্তির বিরুদ্ধে যত মামলাই থাক না কেন, তা নিয়োগ আটকাতে পারে না। রিপোর্ট থাকতে পারে। কেউ রাজনীতি করলে তা দূষণীয় নয়। কোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে। আদালত বিচারের পর দণ্ড দিলে চাকরি হারাবে। কিন্তু সম্ভবত অমুক দল করে, তমুক পত্রিকা পড়ে, এর-ওর সঙ্গে মেশে– এমন বাস্তবতায় কাউকে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই সংগত নয়। তরুণ বয়সে শিক্ষিত সচেতন মানুষের খুব কম অংশ রাজনীতির বাইরে থাকেন। আর দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নিরীহ শিক্ষার্থীদের সরকারি দলের সঙ্গে সংযোগ না রাখলে হলে সিট পাওয়াসহ পড়াশোনা লাটে ওঠার জোগাড়। সেই বাধ্যবাধকতা চাকরি পাওয়ার প্রতিবন্ধক হলে প্রতিবারই সরকার বদলের পর এক দল বঞ্চিত হয়ে যাবে। আমরা কি বারবার বঞ্চনার ইতিহাস তৈরি করব? আমরা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের ‘তুমি অধম– তাই বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন?’ এই আপ্তবাক্যের প্রয়োগ দেখতে চাই। নিয়োগের ক্ষেত্রে অতীতের জুতোয় পা না রেখে নতুন চলা শুরু হোক! পুলিশি প্রতিবেদন দেখেই যদি নিয়োগপত্র জারি স্থগিত থাকে, তাহলে পুলিশই হতে পারত নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তা যেহেতু হয় না, তাই মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে চাকরিতে নিয়োগ হোক কলুষমুক্ত। চাকরি পেতে নানান ধাপ পার হয়ে কেবল পুলিশের বদান্যতার জন্য যেন হাপিত্যেশ করতে না হয়। সে ক্ষেত্রে বিরূপ পুলিশি প্রতিবেদনগুলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশন দিয়ে যাচাই করে দেখার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
আকম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
- বিষয় :
- পুলিশ