হাসপাতালের পার্শ্বে ৪৭ ক্লিনিক
জনস্বাস্থ্যের বিপজ্জনক জ্যামিতি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সমকালে শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনমতে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সন্নিকটে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় অর্ধশত বেসরকারি চিকিৎসালয় ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন্দ্র গড়িয়া উঠিবার বিষয় উদ্বেগজনক হইলেও বিস্ময়কর নহে। রাজধানীসহ দেশের অন্যত্র সরকারি চিকিৎসালয়ের পার্শ্বে বেসরকারি চিকিৎসালয়ের ভিড় দেখিয়া থাকি আমরা। কিন্তু ভয়াবহ বিষয় হইল, খুলনায় অবস্থিত বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলির অধিকাংশের বৈধ অনুমোদন নাই।
সরকারি হাসপাতালের পার্শ্বে বেসরকারি চিকিৎসালয়ের আধিক্যের কারণ অজানা নহে। উহার ধ্রুপদি চিত্রও দেশের সর্বত্র উন্মোচিত। খুলনায় যদ্রূপ হাসপাতালের জরুরি ও বহির্বিভাগে সক্রিয় দালাল চক্র রোগী বা স্বজনকে বিভ্রান্ত করিয়া ঐ সকল অনুমোদনহীন বেসরকারি চিকিৎসালয়ে লইয়া যাইতেছে; খুলনার বাহিরেও তদ্রূপ ঘটিতেছে অহরহ। যেই সংকটে রোগীরা প্রথমে সরকারি হাসপাতালে সেবা গ্রহণের উদ্দেশ্যে আসিয়া থাকে, সেই সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকিলেও বিবিধ ছলচাতুরীর মাধ্যমে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে লইয়া কয়েক গুণ অর্থ হাতাইয়া লইতেছে। কেবল উহাই নহে, ভুল ও জালিয়াতিপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিবেদনের মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসাসেবা ও জীবনেরও ঝুঁকি তৈয়ার হইতেছে।
সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নূতন কোনো বেসরকারি চিকিৎসালয় স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হইবে না বলিয়া সম্প্রতি নির্দেশনা দিয়াছে সরকার। একই সঙ্গে ঐ সীমানার মধ্যে বিদ্যমান বেসরকারি চিকিৎসালয়ে কোনো সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসককে রোগী না দেখিবার নির্দেশনা আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। বস্তুত এইরূপ নির্দেশনা পূর্বেই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হইতেছে, নির্দেশনা কার্যকর হইতেছে কতখানি। যেমন, খুলনায় ঐ নির্দেশনার প্রতিফলন সমকালের সরেজমিন অনুসন্ধানে পরিলক্ষিত হয় নাই।
বস্তুত ইতোপূর্বে সরকারি হাসপাতালের রোগীদের পার্শ্ববর্তী বেসরকারি চিকিৎসালয় কিংবা হাসপাতালে লইয়া যাইবার অভিযোগ উঠিয়াছে বিস্তর। নিরীহ রোগীকে ভাগাইয়া লইবার ক্ষেত্রে হাসপাতালেই বিবিধ চক্র ক্রিয়াশীল। এহেন কর্মে অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ং চিকিৎসকও সংশ্লিষ্ট থাকিবার অভিযোগ রহিয়াছে। রোগীদের সহিত এহেন প্রতারণা বন্ধে সরকারকে কঠোর হইবার বিকল্প নাই।
আমরা দেখিয়াছি, অবৈধ হাসপাতাল ও চিকিৎসালয় বন্ধে প্রশাসনের তরফ হইতে প্রায়শ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়। উহাতে প্রতিষ্ঠানগুলি সাময়িক বন্ধ হইলেও অভিযান শেষ হইতেই বেসরকারি হাসপাতালগুলি অবৈধ কার্যক্রমে স্বরূপে প্রত্যাবর্তন করে। আমরা মনে করি, অভিযানের সময় অবৈধ হাসপাতাল ও চিকিৎসালয়গুলি সম্পূর্ণ বন্ধ করিয়া দিতে হইবে। সেইগুলি পুনরায় যাহাতে কার্যক্রম পরিচালনা করিতে না পারে, তজ্জন্য তদারকিও জরুরি। এই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানে কেবল নূতন নিবন্ধন স্থগিতই যথেষ্ট নহে; অনুমোদন ব্যতিরেকে পরিচালিত চিকিৎসালয় ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন্দ্রগুলি অবিলম্বে বন্ধ করিয়া দেওয়া এবং দালাল চক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদিগের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা লওয়া আবশ্যক। স্বাস্থ্যসেবাকে বাণিজ্য ও প্রতারণার কবল হইতে রক্ষা করিতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। সরকারের নির্দেশনার আলোকে শুরুতেই স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত হইবে দেশে সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে বৈধ-অবৈধ বেসরকারি চিকিৎসালয় চিহ্নিত করা। সমকালের প্রতিবেদনের আলোকে খুলনা হইতেই এই পদক্ষেপ সূচিত হইতে পারে। জনস্বাস্থ্যের এই বিপজ্জনক জ্যামিতি আর সম্প্রসারিত হইতে পারে না।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়