সহজিয়া
‘হার স্টোরি’ আর হারিয়ে যেতে দেব না
আনুশেহ আনাদিল
আনুশেহ আনাদিল
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজকে নারী যখন বিভিন্ন বাহিনী, শিক্ষালয় ও সচিবালয়ে নেতৃত্ব দিতে পারে; চিকিৎসক ও সাংবাদিক হতে পারে; বিমান ও ট্রেন চালাতে পারে, তখন নারী ফুটবল খেলতে পারবে না কেন? নারীকে কারা ঘরে আটকে রাখতে চায়?
এর সূচনা আসলে ইতিহাস থেকে। হাজার হাজার বছর ধরে পুরুষেরাই লিখেছে ইতিহাস। ইতিহাসের ইংরেজি প্রতিশব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘হিজ স্টোরি’ নয়। কিন্তু রূপক হিসেবে কথাটি সত্য। কারণ লিখিত সভ্যতার অধিকাংশ সময়জুড়ে কলম ছিল পুরুষের হাতে। আইন লিখেছেন পুরুষেরা। ক্ষমতা ও জ্ঞানের প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল প্রধানত পুরুষের দখলে। তাই ইতিহাস হয়ে উঠেছে, বহুলাংশে পুরুষের বলা গল্প।
তাহলে কোথায় নারীর ইতিহাস? কোথায় সেই মায়েরা? কোথায় ধাত্রী, চিকিৎসক, কিষানি, তাঁতি, শিল্পী, সংগীতশিল্পী, বিদ্রোহী, সাধিকারা? খেলাধুলার সূচনালগ্নে কি নারী-পুরুষ ভেদ ছিল? নারীরা কি খেলাধুলা করত না?
একজন নারী যদি পরিবার চালাতে পারে; ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে; দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারে; বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব নিতে পারে, তাহলে বহু শতাব্দী আগের পুরুষের অর্থনৈতিক দায়িত্বের ধারণা কেন আজও তার অর্থনৈতিক অধিকার নির্ধারণ করবে?
যুগের পর যুগ পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেন এক পরম কর্তৃত্বের কণ্ঠে নারীকে বলেছে– মান্য করো। বশ্যতা স্বীকার করো। চুপ থাকো। নিজেকে ঢেকে রাখো। পুরুষের নেতৃত্ব দিও না। খুব বেশি স্বাধীন হয়ো না। হয়তো এসব নির্দেশের নিচে লুকিয়ে আছে মানবসভ্যতার প্রাচীনতম ভয়গুলোর একটি– শক্তিশালী নারীর ভয়– যে নারী নিজ অস্তিত্বের জন্য অনুমতি চায় না; যার নিজের অর্থ আছে; নিজের কাজ আছে; নিজের চিন্তা আছে; নিজের কণ্ঠ আছে। যে ভালোবাসতে পারে, কিন্তু কারও সম্পত্তি হয়ে যায় না। যে মা হয়েও নিজের অস্তিত্ব হারায় না।
যে সন্তান ধারণ করতে পারে, সন্তান মানুষ করতে পারে, সংসার সামলাতে পারে, ব্যবসা চালাতে পারে, শিল্প সৃষ্টি করতে পারে, গান লিখতে পারে, প্রবন্ধ লিখতে পারে, নেতৃত্ব দিতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
যে নারী বুঝে গেছে– একজন পুরুষকে বড় দেখানোর জন্য তার নিজেকে ছোট করতে হবে না। এটি আমার নিজের উপলব্ধি– হয়তো কিছু পুরুষ নারীকে ভয় পায় নারী দুর্বল বলে নয়। হয়তো তারা ভয় পায়, কারণ নারী দুর্বল নয়। কারণ যে নারী নিজের শক্তি চিনে ফেলেছে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
নারীর ওপর আমরা অসম্ভব সব শর্ত চাপিয়ে দিয়েছি। সুন্দর হও; কিন্তু বেশি নজর কেড়ো না। বুদ্ধিমান হও, কিন্তু কাউকে ভয় পাইয়ে দিও না। সফল হও, কিন্তু এত সফল হয়ো না যে, কোনো পুরুষ নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। স্বাধীন হও, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেয়ো না। মা হও, কিন্তু মাতৃত্ব যেন তোমার কাজে বাধা না দেয়। শক্ত হও, কিন্তু কোমল থেকো। কণ্ঠ রাখো, কিন্তু খুব জোরে কথা বলো না। কী অসম্ভব এক খাঁচা!
হাজার হাজার বছর ধরে পুরুষের হাতে ছিল কলম। তারা লিখেছে ইতিহাস; নারীরা তখন সন্তান জন্ম দিচ্ছিল। খাদ্য ফলাচ্ছিল। ওষুধ বানাচ্ছিল। শিল্প সৃষ্টি করছিল। গান গাইছিল। সন্তান মানুষ করছিল। ঘর তৈরি করছিল। সমাজ ধরে রাখছিল। যুদ্ধের ভেতর বেঁচে থাকছিল। নিপীড়নের ভেতর বেঁচে থাকছিল। নিজেদের সম্পর্কে লেখা মিথ্যার ভেতরেও বেঁচে থাকছিল।
এখন কিছু বদলেছে। এখন আমরা লিখতে পারি। আমরা প্রকাশ করতে পারি। আমরা কথা বলতে পারি। আমরা নিজেদের কণ্ঠ রেকর্ড করতে পারি। আমাদের নানি-দাদি, দিদিমা-ঠাকুমারা যা বলতে পারেননি, আমরা তা কন্যাদের বলতে পারি। আমরা পুরোনো নথির কাছে ফিরে গিয়ে প্রশ্ন করতে পারি, নারীরা কোথায় ছিল?
আমরা আমাদের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে ভালোবাসতে পারি এবং সেই ঐতিহ্যের চারপাশে শতাব্দীর পর শতাব্দী জমে ওঠা পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যাকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারি। কারণ প্রশ্নহীন শ্রদ্ধা একসময় বশ্যতায় পরিণত হয়। আর সমালোচনাহীন জ্ঞান হয়ে ওঠে এমন এক উত্তরাধিকার, যার কোনো বিবর্তন নেই। হাজার হাজার বছর ধরে অন্যেরা আমাদের নিয়ে লিখেছে।
এবার নারীর নিজের গল্প লেখা দরকার। নারীর ইতিহাস বা ‘হার স্টোরি’। যে শরীরকে ‘অপবিত্র’ বলা হয়েছিল– তার গল্প। যে কণ্ঠকে চুপ থাকতে বলা হয়েছিল– তার গল্প। যে মনকে কম বুদ্ধিমান বলা হয়েছিল– তার গল্প। যে কন্যাকে কম দেওয়া হয়েছিল– তার গল্প। যে স্ত্রীকে বশ্যতা শেখানো হয়েছিল– তার গল্প। যে স্বাধীন নারীকে বিপজ্জনক বলা হয়েছিল– তার গল্প। যে শক্তিশালী নারীকে অস্বাভাবিক বলা হয়েছিল– তার গল্প। যে মায়ের শ্রম কখনও হিসাব করা হয়নি– তার গল্প। যে শিল্পীর নাম হারিয়ে গেছে– তার গল্প। যে চিকিৎসক, ধাত্রী, সাধিকা, কবি, কিষানি, বিদ্রোহীকে ভুলে যাওয়া হয়েছে– তাদের গল্প।
এটাই নারীর ইতিহাস; এটাই ‘হার স্টোরি’। আমরা হাজার হাজার বছর ধরে স্বর্গের সন্ধানে আকাশের দিকে তাকিয়েছি। এবার আমাদের নিচের দিকেও তাকানো উচিত– মাটির দিকে, শিকড়ের দিকে, রক্তের দিকে, গর্ভের দিকে। মেঘ আকাশজুড়ে ভেসে যেতে পারে। কিন্তু বৃষ্টি নেমে আসে পৃথিবীতে। সে মাটির ভেতরে প্রবেশ করে। সে শিকড় খুঁজে পায়। সে বীজকে জাগিয়ে তোলে। যেখানে বৃষ্টি পৃথিবীকে স্পর্শ করে, সেখানে জীবন আবার শুরু হয়।
এবার আমরা তা লিখে রাখব। কারা নারীকে ঘরে আটকে রাখতে চায়, আমরা লিখে রাখব। এবার নারীর ইতিহাস বা ‘হার স্টোরি’ আর হারিয়ে যেতে দেব না।
আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী
- বিষয় :
- আনুশেহ আনাদিল
- নারী