ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

অর্থনীতি

বিদেশি বিনিয়োগের জন্য দরকার আস্থার পরিবেশ

বিদেশি বিনিয়োগের জন্য দরকার আস্থার পরিবেশ
×
×

সৈয়দ এরশাদ আহমেদ

সৈয়দ এরশাদ আহমেদ

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই শুধু বিদেশি পুঁজি আনে না। এর সঙ্গে আসে নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হওয়ার সুযোগ। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য তাই এফডিআই কেবল অর্থের উৎস নয়; অর্থনীতিকে উচ্চতর মূল্য সংযোজনের দিকে নেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

বাংলাদেশ এখন অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার প্রায় ৫০১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪.১৪ শতাংশে।  কিন্তু অর্থনীতির এই আকারের তুলনায় এফডিআই এখনও যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে নিট এফডিআই এসেছে ১.৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের ১.২৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৩৯.৩৬ শতাংশ বেশি।

এফডিআইর পরিমাণের ভেতরের চিত্র আরও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে ইকুইটি মূলধন ছিল মাত্র ৫৫৪.৬৪ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ১.৮৪ শতাংশ বেশি। বিপরীতে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ও আন্তঃকোম্পানি ঋণ এফডিআই বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে, কিন্তু নতুন বিনিয়োগের গতি এখনও ততটা শক্তিশালী নয়।

এফডিআই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
বিদেশি বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্য শুধু ডলারের অঙ্কে মাপা যায় না। একটি ভালো এফডিআই প্রকল্প স্থানীয় কর্মীদের দক্ষ করে; স্থানীয় সরবরাহকারীদের আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে; প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আনে এবং রপ্তানির নতুন বাজার তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ যদি তৈরি পোশাকের বাইরে ইলেকট্রনিকস, ওষুধ, অটোমোবাইল, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, আইটি, আধুনিক লজিস্টিকস ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে এগোতে চায়, তাহলে মানসম্পন্ন এফডিআই প্রয়োজন। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও ভালো এফডিআই, যে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াবে।

বিনিয়োগকারীর আস্থা তৈরি হবে কীভাবে
কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী শুধু কম শ্রমমূল্য বা কর-সুবিধা দেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে না। সে দেখে একটি দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ কতটা নিরাপদ, পূর্বানুমানযোগ্য এবং ধারাবাহিক। এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাজ। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক শর্ত। কারখানা স্থাপন করে কয়েক দশক ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া বিনিয়োগকারীকে জানতে হয়– তার কর্মী, সম্পদ, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিরাপদ থাকবে কিনা। 
বিশ্বব্যাংকের বিনিয়োগ-সংক্রান্ত গবেষণাতেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীল আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতি, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং নীতির ধারাবাহিকতা। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য আজকের নীতি আগামীকালও কার্যকর থাকবে– এমন পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা কমানো, স্মার্ট ডিরেগুলেশন ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

দুর্নীতি কমাতে হবে ব্যবস্থার ভেতর থেকেই
দুর্নীতি ও অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতায় বিনিয়োগকারীর আস্থা ও ব্যবসার খরচ; দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ বিষয়ক প্রাইভেট সেক্টর ডায়াগনস্টিক রিপোর্টেও দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে বেসরকারি খাতের বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর সমাধান শুধু দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য নয়; ব্যবস্থাকেই স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করা। সরকারি অনুমোদন, কর, কাস্টমস, ভূমি রেকর্ড ও সরকারি ক্রয়ে আরও বেশি স্বয়ংক্রিয়তা প্রয়োজন। নির্ধারিত ফি, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং অনলাইনে আবেদনের অগ্রগতি দেখার ব্যবস্থা থাকলে অপ্রয়োজনীয় সরাসরি যোগাযোগ কমবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং অনিয়মের সুযোগও সংকুচিত হবে।

জ্বালানি ও লজিস্টিকস: বিনিয়োগের ভিত্তি
একজন বিনিয়োগকারী কারখানা স্থাপনের পর নিয়মিত গ্যাস বা বিদ্যুৎ না পেলে কর-সুবিধা দিয়েও তাকে ধরে রাখা কঠিন। তাই শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, নির্ভরযোগ্য গ্রিড এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা জরুরি। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশে বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোকে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। একইভাবে লজিস্টিকসকে শুধু পরিবহন হিসেবে দেখা নয়; এটি বিনিয়োগের অবকাঠামো। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বে টার্মিনাল, লালদিয়া ও মাতারবাড়ীর মতো প্রকল্পের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক, রেল, নৌপথ, আধুনিক গুদাম, কোল্ড চেইন ও ডিজিটাল কাস্টমসের সমন্বিত সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকার বিমানবন্দরও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক কার্গো ব্যবস্থাপনা, দ্রুত অভিবাসন ও কাস্টমস, পরিচ্ছন্ন টয়লেট, উন্নত অপেক্ষাকক্ষ এবং পেশাদার যাত্রীসেবা বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক অতিথিদের কাছে বাংলাদেশের প্রথম ধারণাকে ইতিবাচক করতে পারে।

বর্তমানের বিনিয়োগকারীরাই হতে পারেন  দূত
নতুন বিনিয়োগকারী খোঁজার পাশাপাশি বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যথাযথভাবে ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে ভালো অভিজ্ঞতা পেলে তার মূল কোম্পানি, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক এবং নিজ দেশের অন্য উদ্যোক্তাদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিতে পারেন। তাই প্রত্যেক সন্তুষ্ট বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশের একজন সম্ভাব্য ‘অ্যাম্বাসাডর’। তাদের সমস্যা দ্রুত সমাধান, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত সহযোগিতা এবং পুনর্বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম কার্যকর কৌশল হতে পারে।

মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও দক্ষতা
প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ আকর্ষণে মেধাস্বত্ব সুরক্ষাও অপরিহার্য। পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কার্যকর সুরক্ষা না থাকলে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি, গবেষণা ও প্রযুক্তি স্থানান্তরভিত্তিক এফডিআই আকর্ষণ করা কঠিন। শক্তিশালী আইপিআর ব্যবস্থা বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়ায়। একই সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং শিল্পের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ। কারণ ভবিষ্যতের বিনিয়োগকারী শুধু সস্তা শ্রম নয়; দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ খুঁজবে।

প্রয়োজন ‘প্রমোশন’ থেকে ‘ডেলিভারি’
বাংলাদেশের বাজার বড়; শ্রমশক্তি তরুণ; ভৌগোলিক অবস্থান কৌশলগত এবং রপ্তানি সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ সম্ভাবনার ঘাটতি নেই। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে বিনিয়োগকারীর আস্থা ও আস্থাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপান্তর করা। এ জন্য প্রয়োজন বিশ্বমানের অর্থনৈতিক অঞ্চল, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, প্রতিযোগিতামূলক লজিস্টিকস, আধুনিক বন্দর ও বিমানবন্দর, দক্ষ জনশক্তি, শক্তিশালী মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, কার্যকর ওয়ানস্টপ সেবা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং দুর্নীতি কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো– নীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও ধারাবাহিকতা একই সঙ্গে নিশ্চিত করা। বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে আসতে রাজি করানোই শেষ কথা নয়; তাকে সফলভাবে ব্যবসা করতে দেওয়া, পুনর্বিনিয়োগে উৎসাহিত করা ও সন্তুষ্ট রাখাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বিনিয়োগ প্রচারণা।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এফডিআই কৌশলের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত– প্রচার নয়, আস্থা; প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন এবং শুধু নতুন বিনিয়োগ নয়; বিদ্যমান বিনিয়োগকারীর সাফল্য। কারণ একজন সন্তুষ্ট বিদেশি বিনিয়োগকারী শুধু বিনিয়োগকারী নন। তিনি হতে পারেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক অ্যাম্বাসাডর।

সৈয়দ এরশাদ আহমেদ: সাবেক প্রেসিডেন্ট, ফিকি ও অ্যামচ্যাম বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×