ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশন

সতর্কতার সহিত স্বাগত

সতর্কতার সহিত স্বাগত
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ঢাকা মহানগরের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বৈঠকের সিদ্ধান্তসমূহকে আমরা সতর্কতার সহিত স্বাগত জানাই। শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত বৈঠকে রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার মাধ্যমে যানজট কমানোর লক্ষ্যে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকাকে ৩২টি রুটে বিভক্ত করিয়া ঢাকা পরিবহন কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) প্রস্তাবিত বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই পদ্ধতিতে বিদ্যমান রুটসমূহে যেই সকল কোম্পানির বাস চলিতেছে, সেগুলিকে একীভূত করিয়া একটি কোম্পানি গঠন করা হইবে। কাউন্টারভিত্তিক যাত্রীসেবা, ই-টিকিটিং ও জিপিএস ট্র্যাকিং থাকিবে। বাসগুলি নির্ধারিত সময়ে ছাড়িবে; নির্ধারিত স্থানে দাঁড়াইবে ও যাত্রী তুলিবে। এক বাস অন্য বাসকে ওভারটেক করিতে পারিবে না। উপরন্তু বিনিয়োগের অনুপাতে বাস মালিকরা মুনাফা পাইবেন; চালক-শ্রমিকরা চুক্তিতে নহে, কোম্পানির মাসিক বেতনভুক্ত হইবেন। অর্থাৎ আলোচ্য পদ্ধতিতে নগরীতে যাত্রীবাহী বাসসমূহ চলিলে যাত্রীসাধারণের পাশাপাশি মালিক-শ্রমিক তথা সকল অংশীজনই লাভবান হইবে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে, আগামী দুই মাসে বাস স্টপেজ নির্ধারণ, লক্কড়ঝক্কড় বাস মেরামত এবং চালকদের মাসিক বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগ করা হইবে। এই সময়ে কয়েকটি রুট পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হইবে। 

প্রসঙ্গত, রাজধানীতে একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলিবার কারণে যানজট ও বাসে বাসে অসুস্থ প্রতিযোগিতা হয়, যাহাকে এই নগরীর সাংবাৎসরিক সমস্যা যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে ধরা হইয়া থাকে। এই সমস্যার সমাধানস্বরূপ বিভিন্ন উন্নত দেশে সফল হওয়া নগর পরিবহন ব্যবস্থাপনার আদলে একটি রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক একটি কোম্পানির বাস চালাইতে ২০১৫ সালে কমিটি করে তৎকালীন সরকার। ইহার পূর্বে ২০০৪ সালে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) প্রস্তাব করা ‘বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি’ (বিএফএস) রাজধানীতে চালু করিবার দায়িত্ব দেওয়া হয় উক্ত কমিটিকে।  ইহাও উল্লেখ্য যে, উক্ত দীর্ঘ পরিকল্পনা ও যাচাই-বাছাই শেষে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর ঘাটারচর হইতে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ২৬ নম্বর রুটে পরীক্ষামূলক ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস চালু করা হয়, যেখানে কাউন্টারভিত্তিক ই-টিকিটিং সেবা ছিল। নির্ধারিত স্টপেজ হইতে টিকিট ক্রয় করিয়া যাত্রীকে নির্ধারিত স্থানে নামিতে হইত। সকল কিছু মিলাইয়া সেবাটি বেশ জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু এই রুটের অন্যান্য কোম্পানির বাস একীভূত না হওয়ায় সেবাটি এক পর্যায়ে বন্ধ হইয়া যায়। বেহাল পড়িয়া থাকে কয়েক কোটি টাকায় নির্মিত যাত্রীছাউনিগুলি। এইখানেই আমাদের শঙ্কা। একটি ভালো পরিকল্পনা গ্রহণ যতটা সহজ, তাহার বাস্তবায়ন অন্তত এই দেশে–ততটাই দুরূহ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এই পদ্ধতিতে বাস চালুর প্রচেষ্টা দেখা গিয়াছিল, বাসমালিকরা সাড়া না দেওয়ায় যাহা দ্রুতই মুখ থুবড়াইয়া পড়ে। এই প্রসঙ্গে ইহাও স্মরণ করা যাইতে পারে যে, অতীতে বহুবার সড়ক-মহাসড়ক হইতে ফিটনেসবিহীন যানবাহন উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত গৃহীত হইলেও মূলত মালিক-শ্রমিক নেতাদের সিন্ডিকেটের বাধার কারণে কখনোই তাহা কার্যকর করা যায় নাই। দেখা গিয়াছে, খোদ সরকারের মধ্যেই ওই সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি বা পৃষ্ঠপোষকরা প্রভাব লইয়া অবস্থান করিয়াছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনুরূপ অভিযোগ হইতে বর্তমান সরকারও মুক্ত নহে। বর্তমান সড়ক পরিবহনমন্ত্রী যেভাবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপর সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজিকে জায়েজ করার চেষ্টা করিয়াছেন, তাহাও জনমনে এই শঙ্কা জাগায় যে আলোচ্য বৈঠকের সিদ্ধান্তসমূহ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদৌ বাস্তবায়ন হইবে কিনা। অধিকন্তু বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম সমকালকে বলিয়াছেন, সভার সিদ্ধান্তক্রমে লক্কড়ঝক্কড় বাস নির্ধারণ, সেগুলি বাতিল বা মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণসহ বাসে ফিটনেস, শৃঙ্খলা ও আইন মানিয়া চলার বিষয়টি তাহারাই নিশ্চিত করিবেন। এই ক্ষেত্রে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ঘটিলে বিস্ময়ের কিছু থাকিবে না।

তবে এই সকল আশঙ্কা ও উদ্বেগ সত্ত্বেও সরকার যথাযথ নজরদারির সহিত প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করিলে পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন অসম্ভব বলিয়া আমরা মনে করি না। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার সেই পথেই চলিবে।
 

আরও পড়ুন

×