ঢাবি শিক্ষকের ‘শাস্তি’
শ্রেণিকক্ষে সহনশীলতা শ্রেয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৪৪
শ্রেণিকক্ষে সংঘটিত নেকাব বিতর্ক ঘিরিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে একতরফা যেই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গৃহীত হইয়াছে উহা কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত নহে, বিস্ময়করও বটে।
সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার ইংরাজি বিভাগের স্নাতকোত্তরের ক্লাস চলাকালে নেকাব পরিহিত এক শিক্ষার্থীর চক্ষু দৃশ্যমান না থাকায় শিক্ষার্থীর মনোভাব বুঝিতে অসুবিধার কথা বলেন উক্ত শিক্ষক। তিনি ছাত্রীটিকে পশ্চাতের সারিতে বসিবার পরামর্শ দেন। ইহার প্রতিবাদস্বরূপ নেকাব পরিহিত ঐ ছাত্রী ক্লাস হইতে বাহির হইয়া যান। এক পর্যায়ে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীও তাহাকে অনুসরণ করেন। পরবর্তী সময়ে উক্ত বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আহূত বিভাগের জরুরি সভায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের পাঠদানের জন্য নির্ধারিত বিষয়গুলি অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করিয়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
আমরা মনে করি, শিক্ষার্থী অপমানিত বোধ করেন শ্রেণিকক্ষে এমন কোনো বক্তব্য প্রদান বা আচরণ করা কোনো শিক্ষকেরই উচিত নহে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা চর্চার অংশ হিসাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে এমন আলোচনা বা বিতর্কও হইতে পারে, যাহা সাধারণের নিকট আপত্তিকর মনে হইতে পারে, এমনকি সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধেরও সহিত দ্বন্দ্ব ঘটাইতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আলোচ্য বিষয়টি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বিদ্যায়তিনক বিতর্কের মাধ্যমেই সুরাহা হইতে পারিত। কিন্তু ইংরাজি বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের আলোচ্য সিদ্ধান্তের ফলে এই কাঙ্ক্ষিত সুযোগটি হাতছাড়া হইয়াছে। অধিকতর দুঃখজনক হইল, তাসনীম সিরাজ মাহবুবকে শ্রেণি কার্যক্রম হইতে অব্যাহতিদানের সিদ্ধান্তটি গৃহীত হইয়াছে কোনো প্রকার স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ব্যতিরেকে এবং ভুক্তভোগীকে কোনো প্রকার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়া, যাহা বিশেষত গণতন্ত্র চর্চার পীঠস্থান হিসাবে দেশে-বিদেশে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একেবারে বেমানান। এই কারণে উক্ত সিদ্ধান্তকে আমরা বিস্ময়কর বলিয়াছি।
ইতঃপূর্বে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে মৌখিক পরীক্ষার সময় মুখমণ্ডল অনাবৃত রাখার বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মাবলি স্মরণ করাইয়া দেওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা বিভ্রান্তি ছড়াইবার প্রয়াস দেখা গিয়াছে। নিতান্তই বিদ্যায়তনিক একটি বিষয়কে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক রং দিয়া দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের এমনকি জনপরিসরে হেনস্তা করিবার অপচেষ্টা চলিয়াছে। এমন আশঙ্কা অমূলক নহে যে, তাসনীম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে ঐ হীন তৎপরতাই চলিতেছে। শুধু উহা নহে, একটি বিশেষ মহল এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচারে লিপ্ত হইয়াছে তাহার পরিণতিস্বরূপ ভুক্তভোগীর নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হইতে পারে।
স্মরণে রাখিতে হইবে, বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে শুধু ধর্মীয় রীতিনীতি পালন এবং পোশাক পছন্দের অধিকারই দেয় নাই, মতপ্রকাশের অধিকারও দিয়াছে। ইহাও সর্বজনস্বীকৃত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আলোচনা, মতবিনিময় ও বিতর্কের সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। এই ক্ষেত্রে যেই কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা শুধু মুক্তচিন্তার চর্চাকেই রুদ্ধ করিবে না, জ্ঞান সৃষ্টির প্রক্রিয়াকেও বিঘ্নিত করিবে; উন্নতিকামী রাষ্ট্র ও সমাজে যাহার প্রভাব মারাত্মক হইতে বাধ্য। তাই আমাদের প্রত্যাশা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সম্পূর্ণ বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পর্যালোচনা করিবে এবং উভয়পক্ষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করিতে উপযুক্ত পদক্ষেপ লইবে। এই ক্ষেত্রে রোববার সমকালে প্রকাশিত তিন দফা দাবিসংবলিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিটি সহায়ক হইতে পারে, যেইখানে তাসনীম সিরাজ মাহবুবকে শ্রেণি কার্যক্রম হইতে অব্যাহতির সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত; পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজনে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অধিকার ও দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন; এবং অনুমতি ব্যতীত শিক্ষকের বক্তব্য ধারণ ও খণ্ডিতভাবে অনলাইনে ছড়াইয়া দেওয়ার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হইয়াছে।