ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস

বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো

বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে শনিবারের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হইবার ঘটনা বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো প্রবাদটিই স্মরণ করাইয়া দিল। রবিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশ্ন ফাঁস প্রতিহতকরণের লক্ষ্যে রাজধানীর দিলকুশায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের একটি কক্ষে সারারাত্র প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মুদ্রণকার্য চলে। ঐ কক্ষে ছিলেন নিয়োগ কমিটির পাঁচ সদস্য, যাহারা প্রশ্নপত্র তৈরি করেন। তাহাদের সহায়তা করিতে কক্ষটিতে আরও ছিলেন ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ওএমআরডিএম সিস্টেমের ২০ কর্মী। দায়িত্বপ্রাপ্তগণ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঐ কক্ষেই ছিলেন। উপরন্তু তাহাদের সকলের মোবাইল ফোন কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দিতে হয়। এমনকি বন্ধ রাখা হয় ইন্টারনেট সংযোগও। এতৎসত্ত্বেও শুক্রবার রাত্রেই সামাজিক মাধ্যমে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছড়াইয়া পড়ে। শেষ পর্যন্ত স্থগিত করিতে হয় পরীক্ষা।

প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরই কেহ যে এই অপকর্ম সংঘটিত করিয়াছেন, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। উপরন্তু কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে এমন বৃহৎ অপরাধ সংঘটন সম্ভব নহে এবং অপরাধ চক্রটির উপর রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আশীর্বাদ থাকাও অস্বাভাবিক নহে। প্রসঙ্গত, দেশে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বহু বৎসর যাবৎ ফাঁস হইয়া আসিতেছে। এমনকি পিএসসির অধীন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও অনেকবার ফাঁস হইয়াছে। ধারণা করা যায়, ঐ সকল ঘটনা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিয়াই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণের এহেন অভিনব প্রক্রিয়া চয়ন করিয়াছিল। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য, অধিদপ্তরের সেই শিক্ষা গ্রহণে যথেষ্ট গলদ রহিয়াছে। তাই প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা তাহারা নিশ্চিত করিতে ব্যর্থ হইয়াছে।

উদ্বেগের বিষয় হইল, সরকারি দপ্তরটির এহেন ব্যর্থতার মাশুল গুনিতে হইতেছে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রার্থীদের। জানা গিয়াছে, ১১তম গ্রেডের এই পদে মোট শূন্য পদ ২৪২টি হইলেও তিন লক্ষাধিক প্রার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করিবার কথা ছিল। পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে উপনীত হইয়া তাহারা পরীক্ষা স্থগিত হইবার বিষয় অবগত হন। ফলে পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই বিশাল সংখ্যক তরুণ-তরুণীর অমানুষিক শ্রমের বিষয়টি ধর্তব্যে না লইলেও দূরদূরান্ত হইতে ঢাকায় আগমন ব্যয়, তৎসহিত তাহাদের ঢাকায় অবস্থানকালীন ব্যয়ের বোঝা বৃথাই বহন করিতে হইল। মনে রাখিতে হইবে, প্রতি বৎসর দেশে ২০-২২ লক্ষ তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, যাহাদের মধ্যে শিক্ষিত চাকুরিপ্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতে দীর্ঘদিন যাবৎ বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে নূতন মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করিতে পারিতেছে না। এমতাবস্থায় সরকারি চাকুরিই শিক্ষিত তরুণদের নিকট প্রধান ভরসা হইয়া উঠিয়াছে। আমরা জানি, এই পরিস্থিতিতেই ২০২৪ সালে সরকারি চাকুরিতে কোটা প্রথা বিলোপের দাবি জানাইতে গিয়া বিশেষত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীগণ মরণপণ লড়াইয়ে নামিয়াছিল, যাহার পরিণতিতে তৎকালীন সরকারকেই বিদায় লইতে হয়। অতএব সরকারি চাকুরিতে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ন্যায় অপরাধ তরুণদের মধ্যে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা জাগ্রত করে, বলিলেও ভুল হয় না। ইহার ফলে সংশ্লিষ্ট পরিবারসমূহে যেই হতাশা নামিয়া আসে, তাহারই বা খোঁজ কে রাখে!
বস্তুত রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপক হিসাবে এই সকল প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই দিতে হইবে। ইহা সত্য, প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিটা ঘটনার পর ক্ষমতাসীনরা ফাঁকফোকর বন্ধের তোড়জোড় করেন; তদন্ত কমিটি গঠনান্তে দোষীদের খুঁজিয়া বাহির করিবারও চেষ্টা করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কতিপয় অপরাধীকে শনাক্ত করিয়া গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়া সেই মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না; প্রশ্ন ফাঁসও বন্ধ হয় না। প্রতিবেদনমতে, আলোচ্য ঘটনায়ও তদন্ত শুরু হইয়াছে। মতিঝিল থানায় মামলাও হইয়াছে। আমাদের প্রত্যাশা, এইবার শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের রহস্যই উন্মোচিত হইবে না; প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হইবে। 
 

আরও পড়ুন

×