ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

জুলাই সনদ

আবার গণভোট কিংবা গণতন্ত্রের খরচ

আবার গণভোট কিংবা গণতন্ত্রের খরচ
×
×

কাজী মারুফুল ইসলাম

কাজী মারুফুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৮ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

সং বিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি বলেছেন, সংবিধানের মৌলিক কোনো বিষয়ে সংশোধন আনা হলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের প্রস্তাবনা, ১৪২ অনুচ্ছেদ বা সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধানে পরিবর্তন এলে গণভোটের বাধ্যবাধকতা থাকবে (সমকাল, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।    

অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে অনেকে বলছেন, এত ব্যয়বহুল আয়োজনের সামর্থ্য দেশের নেই। কিন্তু আসল প্রশ্নটি সম্ভবত টাকার নয়। প্রশ্নটি হলো: দ্বিতীয় গণভোট কি ফেব্রুয়ারির জনরায়কে পূর্ণতা দেবে, নাকি নতুন ব্যালটে তাকে নতুন করে লিখে নেবে?

পটভূমিটা মনে করা যাক। জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাব ছিল ৪৮টি। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটারের অংশগ্রহণে ৬৮ শতাংশ, অর্থাৎ চার কোটি আশি লাখের বেশি মানুষ ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গাঠনিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা ছিল।

ঘটনাপ্রবাহ অন্য পথে গেছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির সংসদ সদস্যরা সাংসদ হিসেবে শপথ নিলেও পরিষদ-সদস্যের শপথ নেননি। তাদের যুক্তি, বিদ্যমান সংবিধানে এমন কোনো সংস্থার অস্তিত্ব নেই। জামায়াত, এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের সদস্যরা দুটি শপথই নেন। মার্চে হাইকোর্ট বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেন। এরপর ১৩ জুলাই 

বিরোধী দলের ওয়াকআউটের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির নামটি লক্ষণীয়: ‘সংস্কার’ নয়, ‘সংশোধন’।
কমিটি এখন সম্পাদক, শিক্ষক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর মত নিচ্ছে। লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়া এবং জানুয়ারিতে বিল তোলা। কমিটির সভাপতি জানিয়েছেন, মৌলিক বিধান বদলালে সংসদে পাসের পর রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোট হবে। তাঁর ব্যাখ্যায় ফেব্রুয়ারির গণভোট ছিল ‘আইনি’; আর আসন্নটি হবে ‘সাংবিধানিক’।

বিতর্কের মূলে আছে দুটি শব্দ: সংশোধন ও সংস্কার। বিরোধী জোটের দাবি, জনগণ কেবল কিছু প্রস্তাব অনুমোদন করেনি; বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, অর্থাৎ সংস্কার পরিষদকেও অনুমোদন দিয়েছে। সরকারি দলের অবস্থান হলো, সংবিধানের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান সংবিধান বদলাতে পারে না।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম যখন বিএনপি মহাসচিব ছিলেন, একাধিকবার বলেছেন, তারা সংশোধন চান; সংস্কারের কথা কখনও বলেননি। সর্বশেষ বলেছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার আগের মাসে (ডেইলি স্টার, ১৮ জুলাই ২০২৬)।

দুই পক্ষেরই যুক্তি আছে, অস্বস্তিও আছে। বিএনপির আইনি যুক্তি দুর্বল নয়। রাষ্ট্রপতির আদেশে সৃষ্ট সংস্থা নির্বাচিত সংসদের ওপর গাঠনিক ক্ষমতা দাবি করলে সাংবিধানিক শৃঙ্খলা প্রশ্নের মুখে পড়ে। কিন্তু যে দল ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচার চালিয়েছে; ক্ষমতায় এসে সেই রায়ের প্রক্রিয়াগত অংশ নাকচ করলে তা আইনি শুদ্ধতার চেয়ে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ হিসেবেই বেশি পঠিত হবে। অন্যদিকে বিরোধী জোট কমিটি বর্জন করে রাজপথে চাপ বাড়াচ্ছে। অথচ সংসদই এখন একমাত্র কার্যকর মঞ্চ। বর্জনের রাজনীতি অতীতে কাকে লাভবান করেছে, সে অভিজ্ঞতা আমাদের অজানা নয়।

ফলে ৪৮টি প্রস্তাবের ভাগ্য এখন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের বাছাইয়ের ওপর নির্ভরশীল। কমিটি বলেছে, সনদ অগ্রাধিকার পাবে, তবে দলীয় ইশতেহারও বিবেচনায় থাকবে। অনিশ্চয়তাটা এই ‘তবে’র মধ্যেই।

প্রক্রিয়াগত প্রশ্নে একটি ভুল ধারণা শুধরে নেওয়া দরকার। গণভোট এখন আর রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় নয়। পঞ্চদশ সংশোধনী মামলায় হাইকোর্ট ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করেছিলেন এবং চলতি বছর আপিল বিভাগ সেই রায় বহাল রেখেছেন। অর্থাৎ প্রস্তাবনা বা নির্দিষ্ট মৌলিক অনুচ্ছেদ বদলাতে গেলে গণভোট বাধ্যতামূলক। খরচের যুক্তিতে তা এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো মৌলিক বিধানে হাত না দেওয়া, যার মানে সংস্কারকেই নাকচ করা।

খরচের হিসাবও বস্তুনিষ্ঠভাবে দেখা দরকার। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন ও গণভোট মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রাক্কলন ছিল প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। একই দিনে হওয়ায় গণভোটের বাড়তি ব্যয় সীমিত ছিল। আলাদা গণভোটে পুরো জনবল ও নিরাপত্তা আবার মোতায়েন করতে হবে; ব্যয়টা তাই উপেক্ষণীয় নয়। কিন্তু তুলনা হওয়া উচিত বিকল্পের সঙ্গে। বৈধতা-সংকটে ভোগা সংবিধান, রাজপথের সংঘাত আর আদালতের দীর্ঘ মামলার খরচ কোনো বাজেটে লেখা থাকে না। খরচ কমানোর বাস্তব পথও আছে, যেমন পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট আয়োজন।

তবে আসল ঝুঁকি অন্য জায়গায়। দ্বিতীয় গণভোট যদি বাছাই করা, হালকা করা একটি প্যাকেজের ওপর হয়, তবে তা প্রথম রায়কে ‘হালনাগাদ’ করার নামে কার্যত প্রতিস্থাপন করবে। তখন সংখ্যাগরিষ্ঠের অগ্রাধিকারের বিধানগুলো গণভোটের তালায় সুরক্ষিত হবে, আর অস্বস্তিকর প্রস্তাবগুলো নীরবে বাদ পড়বে। গণভোট তখন জনমতের হাতিয়ার না থেকে ক্ষমতার বৈধতা-যন্ত্রে পরিণত হবে।

সামনে তিনটি সম্ভাবনা। প্রথমত, কমিটি যদি উচ্চকক্ষ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা ও সাংবিধানিক নিয়োগে বিরোধী দলের ভূমিকার মতো সনদের মূল প্রস্তাবগুলো সততার সঙ্গে ধারণ করে, তবে দ্বিতীয় গণভোট প্রথম রায়কে সাংবিধানিক ভিত্তি দেবে, বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা-সংকটও মিটবে। দ্বিতীয়ত, প্যাকেজ আংশিক হলে এবং বিরোধী দল বর্জন করলে গণভোট দলীয় শক্তি-পরীক্ষায় পরিণত হবে। আর কম উপস্থিতিতে পাস হওয়া সংবিধান দুর্বল বৈধতা পাবে। তৃতীয়ত, আদালত ও রাজপথের টানাপোড়েনে প্রক্রিয়াটি ঝুলে থাকতে পারে, যা সবচেয়ে ব্যয়বহুল পরিণতি।

প্রথম পথে যেতে সরকারের একটি সহজ কাজ আছে: সনদের ৪৮টি প্রস্তাবের কোনটি গৃহীত, কোনটি পরিবর্তিত, কোনটি বাদ– কারণসহ তার একটি প্রকাশ্য তালিকা দেওয়া। বিরোধী দলেরও উচিত বর্জনের বদলে লিখিত আপত্তি নিয়ে আলোচনার টেবিলে যাওয়া।

শেষ বিচারে, ব্যালটে যদি থাকে প্রথম রায়ের প্রতিশ্রুতি, তবে গণভোটের খরচ গণতন্ত্রেরই খরচ। আর ব্যালটে যদি থাকে সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার অনুমোদন, তবে কোনো অঙ্কেই তা সস্তা নয়।

ড. কাজী মারুফুল ইসলাম: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

আরও পড়ুন

×