দিবস
ট্রাফিক পুলিশ আমাদের বন্ধু
মো. শাহজাহান হোসেন
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষ শনিবার কমিউনিটি পুলিশিং দিবস পালিত হয়। ঢাকার ব্যস্ত সড়কে যানজটে আটকে থাকা মানুষ, রাস্তা পার হতে চাওয়া পথচারী কিংবা নির্ধারিত স্থানে গাড়ি থামানোর নির্দেশ পাওয়া চালকের অভিজ্ঞতা এক নয়। কারও কাছে ট্রাফিক পুলিশ বিপদের সময় সহায়তার হাত, আবার কারও কাছে তারা জরিমানা, মামলা ও বাধার প্রতীক।
যানজট, অনিয়ন্ত্রিত ও যততত্র পার্কিং, অবৈধভাবে ও হাইওয়ে ফুটপাত দখল, গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা ও সড়কে আইন অমান্যের কারণে নাগরিকরা প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হন। এসব সমস্যার মধ্যে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ হয় বলে সামগ্রিক অসন্তোষ অনেক সময় পুলিশের ওপর এসে পড়ে। কোনো সদস্যের অসৌজন্যমূলক আচরণ, পক্ষপাত, দুর্নীতি বা অযথা হয়রানির অভিযোগ থাকলে জনমনে অবিশ্বাস আরও বাড়ে।
অন্যদিকে সড়কে দায়িত্ব পালনকারী একজন ট্রাফিক সদস্যকে প্রচণ্ড রোদ, বৃষ্টি, ধুলাবালি, শীত, ধোঁয়া ও শব্দদূষণের মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। তাঁকে একই সঙ্গে যানবাহনের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, পথচারীদের নিরাপত্তা, জরুরি যানবাহনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পথ করে দেওয়া এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হয়। তার ওপর সকল আইন ও নিরাপত্তা নির্দেশ অমান্যকারী নানান রং ও বাহারের অটোরিকশা, প্যাডেলচালিত রিকশা, জনসাধারণের আইন অমান্য করার প্রবণতা, প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত বা সরু রাস্তাঘাট ট্রাফিক দায়িত্ব পালনকে আরও কঠিন করে ফেলে। বিশ্রামবিহীন টানা কর্মঘণ্টা তো রয়েছেই। তাদের জন্য নেই উপযুক্ত বাথরুম বা দায়িত্ব পালনকালে নিরাপদ স্থান। এসব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তাঁকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যার প্রভাব পড়তে পারে বহু মানুষের নিরাপত্তার ওপর। এই কঠিন বাস্তবতা বোঝা জরুরি, তবে কঠিন কর্মপরিবেশ কখনও অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অজুহাত হতে পারে না।
ট্রাফিক আইন মানতে বলা মানে জনসাধারণের সঙ্গে শত্রুতা নয়। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়; এটি জননিরাপত্তার অংশ। তবে আইন প্রয়োগ হতে হবে সবার জন্য সমান, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ। পরিচয়, সম্পদ, পেশা বা প্রভাবের ভিত্তিতে কাউকে ছাড় দেওয়া এবং অন্য কাউকে অযথা হয়রানি করা আইনের শাসনের পরিপন্থি।
পুলিশ ও জনগণের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক আস্থা। ট্রাফিক পুলিশকে দৃঢ়তার সঙ্গে আইন প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু নাগরিকের সঙ্গে আচরণে থাকতে হবে ভদ্রতা, ধৈর্য ও নিরপেক্ষতা। জনগণের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা এবং ভালো কাজের স্বীকৃতি জনআস্থা বাড়াতে পারে। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের চর্চা আরও কার্যকর করে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও নাগরিক সংগঠনকে সড়কের সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানে যুক্ত করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা কার্যকরের মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এ ধারণা প্রয়োগ করা যেতে পারে।
যে পুলিশ সদস্য সততার সঙ্গে আইন প্রয়োগ করেন, বিপদে মানুষকে সহায়তা করেন এবং সবার জন্য সমান আচরণ নিশ্চিত করেন, তিনি জনগণের বন্ধু। আর যে সদস্য দুর্নীতি, হয়রানি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একইভাবে নাগরিকদেরও আইন মানতে হবে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত পুলিশের অন্ধ সমর্থন কিংবা অন্ধ বিরোধিতা নয়; বরং দক্ষ, সৎ, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক পুলিশিং এবং সচেতন নাগরিকের অংশীদারিত্ব। সড়ক কারও একার নয়, এটি সবার নিরাপত্তা ও জীবনের সঙ্গে জড়িত। মনে রাখতে হবে ঢাকার মতো ছোট আয়তনের বিশাল জনগোষ্ঠীর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এ মহানগরে যানবাহন যতটুকু সচল আছে তা বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যে দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক পুলিশের অনস্বীকার্য সফলতা। তাই ট্রাফিক পুলিশ ও জনগণের সম্পর্ক সংঘাতের নয়, সহযোগিতার হওয়াই কাম্য।
মো. শাহজাহান হোসেন, উপ-পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি, ঢাকা
[email protected]
- বিষয় :
- দিবস