ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

জাপান সফরের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা

জাপান সফরের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা
×
×

এম হুমায়ুন কবির

এম হুমায়ুন কবির

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান ভূ-রাজনীতি ও জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কূটনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ যে কোনো দেশের উন্নয়ন যাত্রাকে বেগবান করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে সেদেশে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার এবং পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক, দুটি অনুদান চুক্তি ও একটি অভিপ্রায়পত্র সই হয়েছে।

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থান খাতে এর সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের যে নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে, তা ভবিষ্যতের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হতে পারে। 

কৌশলগত বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতি সঞ্চার
জাপান স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত উন্নয়ন অংশীদার। সাম্প্রতিক এই রাষ্ট্রীয় সফরের মধ্য দিয়ে জাপান সরকারের পক্ষ থেকে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের (৭৮ হাজার কোটি টাকার বেশি) বিশাল অর্থনৈতিক সহায়তা ও কৌশলগত বিনিয়োগের সুস্পষ্ট আশ্বাস ও সম্মতি এসেছে। অর্থনীতিবিদসহ অন্য বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হলে দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, অবকাঠামো খাত সংস্কার এবং শিল্পায়ন প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রার গতির সঞ্চার করবে। এর ফলে কেবল আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারই চাঙ্গা হবে না, বরং বৈশ্বিক মন্দার প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এটি অত্যন্ত কার্যকর প্রতিরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। 

‘বিগ-বি’ উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি
উভয় দেশের যৌথ অংশীদারিত্বে গৃহীত ‘বিগ-বি’ বা বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট তথা বঙ্গোপসাগরীয় শিল্পাঞ্চল বৃদ্ধি উদ্যোগের আওতায় মহেশখালী ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যে মহাপরিকল্পনা সাজানো হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতি, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, আইসিটি অবকাঠামো এবং বড় ধরনের শিল্পভিত্তিক ভ্যালু চেইন গড়ে তোলার মাধ্যমে অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি প্রধান আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত হবে। ঢাকা মেট্রোরেলের নতুন নেটওয়ার্ক সংযোগ ও কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালুর মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানি কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেশের লজিস্টিকস খাতকে আধুনিক বিশ্বের সমপর্যায়ে উন্নীত করবে। 

কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির সম্ভাবনা
একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। জাপান ঘোষিত এই বিশাল প্যাকেজ ও প্রকল্পগুলো মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত এক থেকে দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান হবে। এর পাশাপাশি জাপানি আধুনিক প্রযুক্তি ও কর্মসংস্কৃতির স্পর্শে আমাদের কর্মক্ষম যুবসমাজ আরও দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর আওতায় নিরাপত্তার জন্য পেট্রোল বোট প্রাপ্তি ও উপকূলীয় নিরাপত্তা বৃদ্ধি সীমান্ত রক্ষা ও ব্লু-ইকোনমি বিকাশে সহায়ক হবে। 

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তাবিত ‘ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট’ (ইপিএ) যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। আগামীতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ যেসব বৈশ্বিক শুল্কমুক্ত সুবিধা বা বাণিজ্যিক সুবিধা হারাবে, সেই ধাক্কা কাটাতে দ্বিপক্ষীয় ইপিএ চুক্তি বড় ধরনের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিমণ্ডলের প্রসারে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট ‘আরসেপ’-এ দেশের যোগদান বিষয়ে জাপানের ইতিবাচক মনোভাব ও সমর্থন বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক কূটনীতিতে আমাদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় ও সম্মানজনক করবে। 

অর্থনৈতিক কাঠামোর পাশাপাশি রয়েছে পরিবেশগত সুরক্ষা। শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা বর্তমান বিশ্বের প্রধান চ্যালেঞ্জ। সফরের অংশ হিসেবে পরিবেশ রক্ষা ও পরিবেশগত টেকসই প্রযুক্তি স্থানান্তরে দুই দেশের মধ্যে পরিবেশবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের বৈপ্লবিক উন্নয়নে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্বাক্ষরিত হওয়া অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। উভয় দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা প্রতিনিধিদের নিয়মিত আদান-প্রদান এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্ব (পিপিপি) বৃদ্ধিতে শীর্ষ পর্যায়ের এই তৎপরতা বেসরকারি খাতকে সরাসরি বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করবে। 

অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা গ্রহণ 
আন্তর্জাতিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতা যতই প্রতিশ্রুতিশীল হোক না কেন, তার বাস্তব সুফল লাভ নির্ভর করে নিজ দেশের সক্ষমতা ও দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে অভ্যন্তরীণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, অর্থনৈতিক ও আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার, ব্যবসা পরিচালনা সহজীকরণ এবং দেশীয় পরিবেশকে পুরোপুরি বিনিয়োগবান্ধব করে তুলতে হবে। জাপানি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে কক্সবাজার ও অন্যান্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্পগুলোর পরিবেশগত ও প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত নিরসন করা আবশ্যক। 

পরিশেষে বলা যায়, টোকিও সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে যে নতুন সম্ভাবনা ও আস্থার বন্ধন তৈরি হয়েছে, তা আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও প্রগতির পথ বহুলাংশে সুগম করবে। জাপানের প্রযুক্তি ও মূলধনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় যুবশক্তি ও ভৌগোলিক অবস্থানের সঠিক মিলন ঘটাতে পারলে এটি দুই দেশের জন্যই এক অনন্য ‘উইন-উইন’ বা পারস্পরিক জয়ের দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এখন সময় এসেছে কালক্ষেপণ না করে নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সম্ভাবনার সুফল দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণে নিবেদিত করা। 
 
এম হুমায়ুন কবির: যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত
 

আরও পড়ুন

×