সমাজ
যে কারণে মনে পড়ে ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’
গওহার নঈম ওয়ারা
গওহার নঈম ওয়ারা
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষের নিষ্ঠুরতা কখনও ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যায় না; শুধু সময়ের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে। সুযোগ পেলেই তা ফিরে আসে– কখনও লাশের ওপর, কখনও কবরের ওপর, কখনও মানুষের শেষ বিদায়ের অধিকার কেড়ে নিতে। শংকরপাশার চিতলিয়া গ্রামে ২৫ অক্টোবর রাতে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি কবর নিয়ে বিরোধ নয়; এটি সভ্যতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রতিহিংসার নগ্ন প্রকাশ। ঘটনাটি শুনে এক বন্ধুর মুখে ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ শব্দটি শুনে মনে হলো, ইতিহাস কি তবে আবারও অন্ধকারের সেই অধ্যায়ে ফিরে যাচ্ছে? ছোটকালে পাঠ্য তালিকায় কথাটি ছিল। পরীক্ষায় অর্থ লিখতে হতো। সেসবের ব্যাখ্যায় অন্ধকার নিষ্ঠুরতা হানাহানি ইত্যাদি লিখতাম মনে হয়। নবীজি আসার আগের যুগে এসব ঘটত। নবীজির তাগাদায় ক্রমেই মানুষের জালিমিপনা শেষ হয়ে আলোর যুগের সূচনা হয়। তবে ইতিহাস সাক্ষী– অমানুষদের রক্তে মিশে থাকা জালিমিপনা আসলে খতম হয় না। সাময়িক ছেদ পড়ে মাত্র। অনেকটা বিরাম চিহ্নের মতো। নতুন অনুচ্ছেদ দিয়ে কখনও শুরু হয় আরেকটি বাক্য দিয়ে। আমার মা তাঁর শাশুড়িকে নিয়ে ৪৬’-এর দাঙ্গার জালিমিপনা থেকে বাঁচতে নদীয়ার কৃষ্ণনগর থেকে কুষ্টিয়ায় চলে এসেছিলেন এক কাপড়ে। বাড়ির পুরুষরা তখন জান বাঁচাতে ছুটে বেড়াচ্ছে গ্রাম থেকে গ্রামে। সেই একই জালিমিপনার মুখে আমার মাকে আবার দাঁড়াতে হয়েছিল একাত্তরে। লুট হয়ে যায় নতুন দেশে এসে ২৫ বছর ধরে সাজানো বাড়িঘর। আবার গ্রাম থেকে গ্রামে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল তাঁকে।
গ্রামগুলো তখন ভরে যাচ্ছিল শহর থেকে পালিয়ে আসা মানুষে। সেই ভিড়ের মধ্যেই জানতে পারি জালিমিপনা আর নৃশংসতার নানা বর্ণনা। এবার ফিরে আসে আইয়ামে জাহেলিয়ার কথা। এর আগে কখনও শুনিনি– মানুষ লাশ ফেলে পালাচ্ছে অথবা পুরুষরা এগিয়ে আসছে না বলে বাড়ির নারীরা কবর দিচ্ছে মরদেহ। ধরমদাহ গ্রামের এক বাড়িতে শুনলাম, তাদের ছেলে মস্ত বড় পুলিশ অফিসার ছিলেন। রাজশাহীতে তাঁকে পাকিস্তানিরা মেরে লাশ ফেলে রাখলে শহীদের স্ত্রী আর তাঁর মেডিকেল ছাত্রী কন্যা তাঁকে কবরস্থ করেন। সে এক অবিশ্বাস্য, মর্মান্তিক কাহিনি। কয়দিন পর ধরমদাহ গ্রামেও পাকিস্তানিরা আক্রমণ করে। এবার নিহত হন সেই শহীদ আজিজুর রহমানের বৃদ্ধ পিতা। পিতা এবং পিতামহের হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী সেই মেডিকেল ছাত্রী হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. লায়লা পারভীন বানু।
ডা. লায়লা পারভীন বানু ছাড়াও অনেক নারীকে নিজ পিতা-সন্তান-স্বামীকে কবরস্থ করতে হয়েছে নতুন করে ফিরে আসা ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’য়। কুষ্টিয়ায় ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর পুনর্দখল ও হত্যাযজ্ঞের সময় নিজ বাড়িতে খুন হন শহীদ হামিদ খান। পরে তাঁর স্ত্রী ও মা বাড়ির উঠানেই তাঁকে কবর দেন। বেগম মুশতারী শফীর লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’ গ্রন্থে এ রকম অনেক ঘটনার হদিস আছে। মনি ইমাম ও তাঁর ছোট বোন রওশন আরা মোস্তফা স্বামী কাজী আলী ইমাম ও চিকিৎসক ডা. গোলাম মোস্তফার কবর নিজেরাই খুঁড়েছিলেন।
পরিবারের নারীরা রাস্তা থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। পাকিস্তানি সেনারা মরদেহ বাইরে নিয়ে যেতে বাধা দেয় এবং কবর না দিতে হুমকি দেয়। পরিবারের নারীরা রান্নাঘরের দা, বঁটি, খুন্তি ও বড় চামচ দিয়ে উঠানে কবর খোঁড়েন। এরপর নিজেরাই স্বামীর মরদেহ কবরের মধ্যে শুইয়ে মাটিচাপা দেন।
শংকরপাশার চিতলিয়া গ্রামের ঘটনা শোনার পর থেকেই একের পর এক একাত্তরের ঘটনাগুলো মনে পড়তে থাকে। মনে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলম শিবলীর মায়ের কথা। পাকিস্তানি সেনারা শিবলীকে হত্যা করে তাঁর দেহ পদ্মায় ফেলে দিয়েছিল। শিবলীর মা পাকিস্তানি বাহিনীর অনুমতি নিয়ে নদী থেকে ছেলের দেহ তুলে আনেন এবং তাদের বসতভিটায় কবর দেন। শিবলীর বাবা ও এক ভাইকেও এর আগে হত্যা করা হয়েছিল।
মনে পড়ে যায় রাজশাহীর চারঘাটের থানাপাড়ার কথা। সেখানে সব পুরুষ সদস্যকে হত্যা করে গ্রামগুলোকে কার্যত ‘বিধবার গ্রাম’ বা ‘বিধবাপল্লি’তে পরিণত করা হয়েছিল। সেসব গ্রামের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক দিক হলো– যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের দাফন করার দায়িত্বও অনেক ক্ষেত্রে নিতে হয়েছিল তাদের স্ত্রী, মা, বোন, কন্যা কিংবা অন্য নারী আত্মীয়দের। কোথাও প্রতিবেশী ও বেঁচে যাওয়া গ্রামবাসীরাও এ কাজে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু শংকরপাশায় যা ঘটল তা একাত্তরকেও ছাড়িয়ে যায়। মানিক পশারী ছিলেন চিতলিয়া গ্রামের একজন বাসিন্দা এবং জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অন্যতম সাক্ষী। মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা এবং তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন কিনা; সেটি কি তাঁর জানাজা ও দাফনের অনুমতির জন্য বিবেচ্য হতে পারে?
পাকিস্তানি সেনারা শহীদ শিবলীর মায়ের আকুতি শুনেছিল। তাঁকে পদ্মা থেকে ছেলের লাশ তুলে আনতে শেষ পর্যন্ত বাধা দেয়নি। সাহায্য না করলেও কেউ খুঁড়ে রাখা কবর মাটি দিয়ে বুজিয়ে দেওয়ার মতো কাজকে উৎসাহিত করেনি। কিন্তু গণমাধ্যমের বরাতে পড়ছি– মানিক পশারীর জন্য খোঁড়া কবর বুজিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়া তিন নারীর কবর খোঁড়ার ছবিটি কি বলে না, এ কোন ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’র দিকে আমরা হাঁটছি?
গওহার নঈম ওয়ারা: একাত্তরের সামাজিক ইতিহাস বইয়ের লেখক
- বিষয় :
- গওহার নঈম ওয়ারা