ইসলাম
খলিফা উমরের (রা.) রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
শামসুল ইসলাম আল বরাটী
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আর আধুনিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। সাফল্য নির্ভর করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জনকল্যাণ এবং সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষায়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর শাসনামল এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশেষভাবে প্রশংসিত। তাঁর প্রশাসনিক উদ্যোগে যেমন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি প্রাধান্য পেয়েছে দরিদ্র, অসহায় ও দুর্যোগপীড়িত মানুষের কল্যাণ। বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, রাজস্বের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, কৃষির উন্নয়ন এবং নাগরিকের অভিযোগ জানানোর সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১০ বছর তিনি বিশাল একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করেন।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি
হজরত উমর (রা.) হিজরি সনের প্রবর্তক। নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারি পঞ্জিকা হিসেবে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরতের সময় থেকে নতুন সন শুরু করেন। হজরত উমর (রা.) রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের লক্ষ্যে নাগরিকদের নাম তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা নেন, যা জনশুমারি নামে পরিচিত। এই তালিকার ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তিদের ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সমন্বয় প্রতিষ্ঠায় তিনি জেলা ও প্রাদেশিক কার্যালয় গড়ে তোলেন। সরকারি নির্দেশনা আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধার্থে ডাক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেন। রাস্তা, সেতু ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণেও গুরুত্ব দেন হজরত উমর (রা.)। তাঁর সময়ে বসরা, কুফা, মসুলের মতো বড় বড় শহরে উন্নত ধরনের রাস্তা নির্মাণ করে যোগাযোগ সহজ করেন।
তাঁর শাসনব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিতের চেষ্টা। হজ মৌসুমে বিভিন্ন অঞ্চলের গভর্নর, বিচারক ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত সভায় তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রকাশ্যে উত্থাপন ও নিষ্পত্তির সুযোগের চর্চা করেছিলেন তিনি। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তিনি ছয় সদস্যের শূরা কমিটি গঠন করেন। প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ তদন্ত এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের ওপর নজরদারির ব্যবস্থাও ছিল তাঁর শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বিচার ব্যবস্থা ও জননিরাপত্তা
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় হজরত উমর (রা.) বিচারক ও কাজিদের দায়িত্ব পালনে গুরুত্ব দেন। বিচারকার্যকে প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়। বিচারকদের সম্মানজনক বেতন দেওয়ার ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করা। নাগরিকদের জানমাল ও সম্মান রক্ষায় তিনি পুলিশি ব্যবস্থা সুসংগঠিত করেন। রাতে পাহারা ও টহলের ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য বিশেষ দপ্তর প্রতিষ্ঠার কথাও ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। খলিফা উমর ফারুক (রা.) মদিনা রাষ্ট্রের অন্তর্গত সকল শহরের সীমান্তবর্তী এলাকায় এবং উপকূলবর্তী গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সামরিক চৌকি প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর সমগ্র প্রশাসনিক অঞ্চলকে ৯টি সামরিক এলাকায় বিভক্ত করে প্রতিটি সেনানিবাসে পর্যাপ্ত অশ্বারোহী সৈন্য সবসময় প্রস্তুত রাখতেন। ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর নজরদারির দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে তিনি গোয়েন্দা বিভাগ চালু করেন। রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জান-মাল ও ইজ্জতের যথার্থ হেফাজতের জন্য একটি সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল পুলিশ বাহিনী গঠন করেন।
অর্থনীতি, কৃষি ও জনকল্যাণ
হজরত উমর ফারুক (রা.) সর্বপ্রথম জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গঠন করেন। রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থা সুসংগঠিত করতে ভূমি জরিপ, ভূমিকর নির্ধারণ এবং রাজস্ব সংক্রান্ত দপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল খনন এবং কৃষকদের আর্থিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা এবং উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক নীতি গ্রহণও তাঁর প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য দিক।
বায়তুল মালের অর্থ থেকে নাগরিকদের ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ইসলামের জন্য ত্যাগ ও অবদান এবং অন্যান্য বিবেচনার ভিত্তিতে মানুষের জন্য ভাতা নির্ধারণ করা হতো। পাশাপাশি বেকার ও অসহায় মানুষ, ইয়াতিম এবং দরিদ্রদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। হিজরি ১৮ সনে আরব অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। অভাবগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করাও তাঁর জনকল্যাণমূলক নীতির অংশ ছিল।
দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় ওয়াক্ফ সম্পত্তি ব্যবহারেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পথচারী ও মুসাফিরদের জন্য বিশ্রামাগার এবং অতিথিশালা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কব্যবস্থা নিয়েও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় মানবকল্যাণের গুরুত্ব
তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা রাজস্ব সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিকের অভিযোগ শোনা, কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জনকল্যাণ ও ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে রাখার এই দৃষ্টিভঙ্গিই হজরত উমর (রা.)-এর প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্য আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
হজরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, ডাক বিভাগ চালুকরণ, বিচার বিভাগ প্রশাসন থেকে পৃথককরণ, জননিরাপত্তা, রাজস্ব, কৃষি, বিচার ও সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এসব ব্যবস্থার পেছনে রাষ্ট্র পরিচালনাকে সুশৃঙ্খল করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন ঘটানোর লক্ষ্য ছিল। তাঁর সময়ে ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ, শিশু ভাতা প্রবর্তন ও সংবাদপত্র চালু করা হয়।
শামসুল ইসলাম আল বরাটী: সমাজসেবক
ও লেখক, রাজনীতিবিদ
- বিষয় :
- ইসলাম