ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্ব নগর দিবস

বাসযোগ্যতার তলানিতে থাকাই যেন নিয়তি

বাসযোগ্যতার তলানিতে থাকাই যেন নিয়তি
×
×

সামছুর রহমান আদিল

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ সময় ধরে বাসযোগ্য শহরের তালিকার তলানিতে রয়েছে আমাদের ঢাকা শহর। চলতি বছরেও বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে বাসযোগ্যতার দিক দিয়ে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। তালিকায় ঢাকার নিচে থাকা অন্য দুই শহর যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক ও লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি। মোটাদাগে পরিকল্পনাহীনতা ও ব্যবস্থাপনার অভাব ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য নগরে পরিণত করেছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ঢাকার মতোই অপরিকল্পিত নগরায়ণ বর্তমানে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্ধ এবং ভূমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ২০০৮ সালে দেশের পৌরসভাগুলোর মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছিল। ইতোমধ্যে আড়াই শতাধিক পৌরসভার মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। এসব পরিকল্পনা প্রণয়নে সরকারের খরচ হয়েছে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। কিন্তু নানা জটিলতায় এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ফলে গ্রামীণ নগর হিসেবে পরিচিত পৌরসভাগুলো অপরিকল্পিতভাবে বিস্তার লাভ করছে।

আজ ৩১ অক্টোবর, শনিবার পালিত হচ্ছে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘বিশ্ব নগর দিবস’। টেকসই নগর উন্নয়নকে উৎসাহিত করাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। ২০১৪ সাল থেকে সারাবিশ্বে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘নগরের পুনরুজ্জীবন: সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’। প্রতিপাদ্যটি নগরের পুরোনো ও অবহেলিত এলাকাগুলোর উন্নয়নের পাশাপাশি সবার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টিও তুলে ধরে। বাংলাদেশের জন্যও এই ভাবনা প্রাসঙ্গিক। 

জাতিসংঘের আবাসনবিষয়ক সংস্থা ইউএন-হ্যাবিট্যাটের মতে, আদর্শ আবাসস্থলের জন্য পাঁচটি শর্ত পূরণ জরুরি: নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন, পর্যাপ্ত বসবাসের জায়গা, টেকসই কাঠামো এবং উচ্ছেদের ভয়মুক্ত মালিকানা। অন্যদিকে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ বস্তি বা নিম্নমানের আবাসস্থলে বসবাস করে, যেখানে আদর্শ আবাসনের শর্তগুলো পূরণ হয় না। 
আবাসন সংকট নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত নতুন ফ্ল্যাট, আবাসন প্রকল্প কিংবা ভবনের সংখ্যা সামনে আসে। কিন্তু একটি শহরে কত ভবন তৈরি হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেখানে কত মানুষ নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে নিরাপদ ও মানসম্মত বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে। 

 জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ২০২৪ সালের এক বিশ্লেষণে বলেছে, দেশে শহরাঞ্চলের জনসংখ্যা ২০০০ সালের প্রায় তিন কোটি থেকে ২০২৩ সালে সাত কোটিতে পৌঁছেছে। ওই বিশ্লেষণে আবাসন ঘাটতি প্রায় ৬০ লাখ ইউনিট বলে উল্লেখ করা হয়। এই ঘাটতি ২০৩০ সালে এক কোটি পাঁচ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে আবাসনের যে চাহিদা তৈরি হবে, তার প্রায় ৭০ শতাংশই সাশ্রয়ী আবাসনের।

বাংলাদেশের নগর এলাকায় আবাসন সমস্যার একটি বড় দিক হলো, মানুষের আয় ও আবাসন ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগের কারণে মানুষ শহরমুখী হন। কিন্তু শহরের কেন্দ্রের কাছাকাছি বাসা ভাড়া নেওয়া অনেক পরিবারের জন্য কঠিন। ফলে অনেকে কর্মস্থল থেকে দূরে থাকেন এবং দীর্ঘ সময় যাতায়াতে ব্যয় করেন। অন্যরা অল্প জায়গায় বেশি মানুষ নিয়ে বসবাস করেন। নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও তীব্র। তাদের অনেকেই অনিরাপদ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসবিহীন বাসস্থানে থাকেন এবং সেখানে পানি, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক নাগরিক সেবার অভাব থাকে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আবাসনের চাহিদা সামাল দিতে দেশের নগর এলাকাগুলোতে অবিরাম গড়ে উঠছে বৈধ-অবৈধ স্থাপনা ও বাজারঘাট। দেদার ভরাট করা হচ্ছে জলাশয়, নদী ও খাল। ভবন নির্মাণে বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না। ফলে বাড়ছে ভবনধস ও অগ্নিনিরাপত্তার ঝুঁকি। নগরে নেই যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আধুনিক একটি শহরে যেসব নাগরিক সেবা থাকা প্রয়োজন, তার ছিটেফোঁটাও নেই অনেক নগর এলাকায়।

বিএনপি ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রকাশ করে। এতে ঢাকার আবাসন সংকট এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও রূপরেখা তুলে ধরা হয়। নিম্ন আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীদের আবাসন সংকট দূর করতে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত আবাসনের ব্যবস্থা, আবাসন ব্যবস্থাপনাকে শৃঙ্খলায় আনতে পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং আবাসন এলাকার পরিবেশগত মান বাড়াতে সমন্বিত বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

 বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে আবাসন-সংক্রান্ত বিভিন্ন নাগরিক সেবা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে স্থানীয় সরকারকে আরও শক্তিশালী 
করার কথা বলা হয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা নির্ধারণ, অর্থায়ন এবং অগ্রগতি পরিমাপের ব্যবস্থা।
আবাসন সংকটের সমাধান এক দিনে সম্ভব নয়। আবাসন কেবল ব্যক্তিগত সামর্থ্যের বিষয় নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, ভূমির ব্যবহার, গণপরিবহন, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক সেবার সঙ্গে সরাসরি 
যুক্ত। এই বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনায় না নিলে নতুন আবাসন তৈরি করেও সংকটের সমাধান করা যাবে না। শুধু কত ভবন তৈরি হলো, তা নয়; বরং কত মানুষ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বাসস্থান পেল, সেটিই হওয়া উচিত আবাসন নীতির সাফল্য বিচারের মানদণ্ড।
 
সামছুর রহমান আদিল: সাংবাদিক 
ও যোগাযোগবিদ
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×