ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

মেরামতের কথা বলে সরল দুই ফেরি, চলছে অন্যপথে

মেরামতের কথা বলে সরল দুই  ফেরি, চলছে অন্যপথে
×
×

মেরামতের নামে চিলমারী-রৌমারী নৌপথ থেকে সরিয়ে নেওয়া ‘কুঞ্জলতা’ রয়েছে চাঁদপুর-শরীয়তপুর রুটের ঘাটে, আর ‘কদম’ চলছে ভোলার ইলিশা ঘাটে। ছবিগুলো শুক্রবার তোলা হয়েছে সমকাল

রিয়াদুল ইসলাম বাবু, চিলমারী (কুড়িগ্রাম)

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

মেরামতের কথা বলে কুড়িগ্রামের চিলমারী-রৌমারী নৌপথ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল ‘কুঞ্জলতা’ ও ‘কদম’ নামে দুটি ফেরি। কিন্তু ফেরি দুটি এখন আর ডকইয়ার্ডে পড়ে নেই; চলাচল করছে অন্য দুটি নৌপথে। ‘কুঞ্জলতা’ রয়েছে চাঁদপুর-শরীয়তপুর রুটের ঘাটে, আর ‘কদম’ চলছে ভোলায়। প্রশ্ন উঠেছে, মেরামতের কথা বলে সরিয়ে নেওয়া ফেরি দুটি কবে ফিরবে, আর আদৌ এই নৌপথে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হবে কিনা।

২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চিলমারী-রৌমারী নৌপথে ফেরি সার্ভিস চালু হয়। তবে বিভিন্ন সময়ে নানা জটিলতায় সেবাটি বন্ধ ও পুনরায় চালু হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৪ আগস্ট থেকে ফেরি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। প্রথমে ‘কুঞ্জলতা’ এবং পরে ‘কদম’ ফেরিকে মেরামতের জন্য ডকইয়ার্ডে নেওয়ার কথা বলে চিলমারী ঘাট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে ফেরি দুটি অন্য ঘাটে চলাচল করছে বলে জানা গেছে। এতে ফেরি দুটি সাময়িক মেরামতের জন্য সরানো হয়েছিল, নাকি অন্য রুটে ব্যবহারের জন্য সংযুক্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ফেরি চলাচল বন্ধের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা নাব্য সংকটের কথাও বলছেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিসির এক কর্মকর্তা জানান, চিলমারী থেকে রৌমারী যাওয়ার পথে ফেরি কিছু যানবাহন বহন করতে পারলেও ফিরতি পথে খালি ফেরি নিয়ে ফিরে আসতে হতো। এতে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি ফেরি পরিচালনার অর্থনৈতিক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দেশের অন্যান্য ফেরিঘাটের নাব্য সংকট নিরসনে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণের বরাদ্দ থাকলেও চিলমারী নদীবন্দরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হতো মাত্র দুই থেকে তিন লাখ ঘনমিটার। প্রয়োজনের তুলনায় এই বরাদ্দ কম হওয়ায় নাব্য সংকট নিরসন সম্ভব হচ্ছে না। 

এদিকে চিলমারী নদীবন্দর উন্নয়নে ৩৪৫ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। ২০২১ সালের ৮ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। রমনা এলাকায় নদীবন্দরের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। এ সময়ে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় প্রকল্পের সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
নদীবন্দরের অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি নৌপথের নাব্য, ফেরি পরিচালনা ও দুই পাড়ের যোগাযোগ সচল রাখার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের প্রশ্ন, বন্দর উন্নয়নে বিপুল অর্থব্যয় হলেও যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ফেরি চালু না থাকলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা এর সুফল পাবেন কীভাবে?
এরইমধ্যে চিলমারী ঘাটে বাণিজ্য, মেরিন, হিসাব, প্রকৌশল ও ফেরি পরিচালনাসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কয়েকজনকে ধাওয়াপাড়া নদীবন্দর, ঢাকা-কাশীপুর ও আরিচা ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে সংযুক্ত বা বদলি করা হয়েছে। এমনকি কলেজ মোড়ের কার্যালয়টিও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
চিলমারী নদীবন্দরের সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক আকিব সোহেল আকাশ বলেন, ‘এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেশের অন্যান্য ফেরিঘাটে সংযুক্ত করা হয়েছে। ফেরি চালু করা হলে তাদের আবার এ ঘাটে নিযুক্ত করা হবে।’

তবে ফেরি সার্ভিস পুনরায় চালুর নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যত্র সংযুক্তি এবং অস্থায়ী কার্যালয় ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ফেরি চালুর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত না এলে নৌপথটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকতে পারে।
ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় বিকল্প পথে যাতায়াত করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। পণ্যবাহী যানবাহনকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হওয়ায় জ্বালানি খরচ বাড়ছে। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য বাজারে পৌঁছানো নিয়েও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
ট্রাকচালক সাদেকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করায় জ্বালানি খরচ ও সময়বেশি লাগছে। ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, সময়মতো বাজারে পণ্য পৌঁছাতে না পারায় লাভ কমে যাচ্ছে। নিয়মিত যাত্রী শাহ মোমেনও দ্রুত ফেরি সার্ভিস চালুর দাবি জানান।

রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি নাহিদ হাসান বলেন, ‘ফেরিসেবা মূলত একটি জনকল্যাণমূলক সরকারি উদ্যোগ। তাই এখানে কেবল লাভ-ক্ষতির বাণিজ্যিক হিসাব কষে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন নয়। দেশের অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ রুটে যদি ফেরি চলাচল সচল রাখা সম্ভব হয়, তবে চিলমারী–রৌমারী নৌপথের মতো জনবান্ধব রুট বন্ধ রাখা সত্যিই দুঃখজনক। সর্বসাধারণের দুর্ভোগ নিরসনে দ্রুত ফেরি সার্ভিস চালুর দাবি জানাচ্ছি।’
কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক বলেন, ‘চিলমারী-রৌমারী নৌপথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এখান থেকে ফেরি তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ কম গুরুত্বপূর্ণ অনেক ফেরিঘাটে সার্ভিস সচল রাখা হয়েছে। ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আমি সংসদে নোটিশ দিয়েছি। আগামী সংসদ অধিবেশনে এ বিষয়ে কথা বলব।’
প্রথমে এ রুট থেকে ফেরি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে অবশ্য স্বীকার করে বলেন, ‘গত তিন বছর এ রুটে ফেরি চলাচলের অভিজ্ঞতা ও সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে দেখা গেছে, এখানে ফেরি চলাচল সম্ভব নয়। এ কারণে ফেরি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে সরকার চাইলে আবারও এ রুটে ফেরি সংযুক্ত করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ রুটের দূরত্ব অনেক বেশি। রুটটিকে লাভজনক করতে হলে দূরত্ব কমাতে হবে। পাশাপাশি স্থায়ীভাবে নৌ চ্যানেল সচল রাখতে হবে। এসব নিশ্চিত করা গেলে দিনে ও রাতে ফেরি চলাচল সম্ভব হবে।’

আরও পড়ুন

×