ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার : ফরিদা জামান

‘শিকড়ের টান চিরকালীন’

‘শিকড়ের টান চিরকালীন’
×

ফরিদা জামান

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফরিদা জামান, একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চিত্রশিল্পী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহেরীন আরাফাত
-------------------------------------------------------

আপনার শৈশবের বৈশাখ উদযাপনের স্মৃতি দিয়ে শুরু করতে চাই। আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠা তো চাঁদপুরে?
চাঁদপুরে জন্ম, তবে বাবার চাকরিসূত্রে আমার শৈশবটা কেটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনায়। কাপ্তাইয়ের কেপিএম হাই স্কুলে আমার পড়াশোনার হাতেখড়ি। সেটাই আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। আমার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানার সাচিয়াখালী গ্রামে, ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে। আমার যখন দুই-তিন বছর বয়স, তখন আমরা গ্রাম ছেড়ে চলে আসি। এরপরও গ্রামে নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
আমার জন্ম ১৯৫৩ সালে। স্কুলে খেলাধুলা হতো, আর যেহেতু ব্রিটিশদের কিছুটা প্রভাব তখনও ছিল, তাই উৎসবগুলো সেভাবেই উদযাপিত হতো। তবে আমার চিত্রশিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে যে উপাদান ও অনুপ্রেরণা, তার সবই সাচিয়াখালী গ্রাম থেকে।

গ্রামের বৈশাখী মেলা বা লোকজ শিল্পের সাথে আপনার পরিচয় কীভাবে ঘটেছিল?
স্কুলে উৎসব বলতে আনন্দ, খেলাধুলাই বেশি হতো। আর কিছু কিছু ব্রিটিশ আমেজের বিষয়ও ছিল।

সেসময় গ্রামে বৈশাখবরণের বিষয়গুলো, যেমন–হালখাতা বা অন্যান্য বিষয় কি মনে পড়ে?
তখনকার গ্রামীণ জীবনটাই আমার বড় অনুপ্রেরণা। মাটির পুতুল বা হাতপাখা—এগুলো আমরা ছোটবেলায় দেখেছি। এখন যেমন প্লাস্টিকের জিনিসপত্র চলে এসেছে, তখন সেগুলো ছিল না। তালপাতার তৈরি বাঁশি, বেতের তৈরি খেলনা—এগুলো দেখেছি। মনে আছে, আমার বাবার মামি, যাকে আমরা দাদি বলতাম, তিনি বেতের ফল দিয়ে, গাব গাছের আঠা দিয়ে কালো, লাল রং বানাতেন। এগুলো দিয়ে তিনি পাটিতে বেগুন গাছের নকশা করতেন। পুরনো কাপড়ের পাড় থেকে সুতা বের করে তা দিয়ে নকশা করতেন। পাটির চারদিকে নতুন লাল-নীল-হলুদ কাপড় দিয়ে কুচি কুচি দিয়ে পাড় দিতেন। এর সবই বৈশাখের একটা অংশ ছিল। খাওয়া-দাওয়া তো হতোই। এই যে বাঁশ, বেত আর পাটের তৈরি গ্রামীণ শিল্পগুলোই আমার শিশুমনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। 

সাচিয়াখালী গ্রামে কি এখনো যাওয়া হয়?
হ্যাঁ, ঈদের ছুটিতে গিয়েছিলাম। আমাদের পুরোনো যে কাছারি ঘরটা ছিল, সেটা আমার ছোট ভাই রিনোভেট (সংস্কার) করেছে। আমি সেখানে বসে ছবি আঁকার পরিকল্পনা করছি। আমাদের গ্রামে প্রচুর তালগাছ আর নারকেল গাছ আছে; প্রকৃতির এই উপাদানগুলো নিয়ে কাজ করতে চাই। জীবনের এই পর্যায়ে এসে ওই কাছারি ঘরে বসে গ্রামীণ প্রকৃতি আঁকতে চাই। অসুস্থতার কারণে যদিও চলাফেরায় কিছুটা অসুবিধা হয়, তবুও আমি ঝুঁকি নিয়েই গ্রামে যাই। কারণ, শেকড়ের টান চিরকালীন, প্রবলভাবে অনুভব করি। 

আপনি চারুকলায় ভর্তি হয়েছিলেন কবে? তখনকার বৈশাখ উদযাপন কেমন ছিল?
১৯৬৯ সালে চারুকলায় ভর্তি হই। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত চারুকলায় পড়েছি। চারুকলায় তখন ছোট পরিসরে মেলা বসত। সোনারগাঁও বা অন্যান্য জায়গা থেকে মৃৎশিল্পীরা আসতেন মাটির পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে। উৎসবের আমেজ ছিল একেবারেই ছিমছাম, সাধারণ এবং নিখাদ বাঙালি ঘরানার।

১৯৮৯ সালে চারুকলায় যখন প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়, আপনি তখন সেখানকার শিক্ষক। সেই সময়টাকে কীভাবে দেখেছিলেন?
১৯৭৮ সালে চারুকলায় শিক্ষকতা শুরু করি। ১৯৮৯ সালে যখন প্রথম শোভাযাত্রার উদ্যোগ নেওয়া হলো, তখন আমি ইতিবাচকভাবেই দেখেছিলাম। কারণ এটি ছিল একটি সর্বজনীন, অসাম্প্রদায়িক এবং বিশুদ্ধ আনন্দের উৎসব। এখানে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। সেসময় শোভাযাত্রায় মূলত গ্রামীণ এবং লোকজ উপাদানগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়া হতো। কাগজের তৈরি মুখোশ, মাটির পুতুল, পাখি, বাঘ—এই মটিফগুলোই ছিল শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ।

বর্তমান সময়ের মঙ্গল শোভাযাত্রা বা বর্ষবরণ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
সময়ের সাথে সাথে সবকিছুরই পরিবর্তন হয়। এখন মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিসর অনেক বেড়েছে, এটি ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। কিন্তু এর পাশাপাশি উৎসবটি এখন অনেকটাই বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে গেছে বলে আমার মনে হয়।
আগে মেলায় বাঁশ, বেত, মাটি বা তালপাতার তৈরি জিনিসের যে কদর ছিল, এখন সেখানে প্লাস্টিকের জিনিসের আধিক্য দেখা যায়। তালপাতার বাঁশির জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিকের বাঁশি বা ভুভুজেলা। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বেড়েছে ঠিকই, সেই সাথে কৃত্রিমতাও প্রবেশ করেছে। তবে এটা যুগেরই দাবি হয়তো। তবে এটা সত্যি যে, এখনকার উৎসবে আগের সেই মাটির গন্ধটা নেই।

নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতি আপনার কোনো বার্তা আছে কি? নিজস্ব শিকড় বা লোকজ উপাদানের ব্যবহার শিল্পকলায় কতটা জরুরি?
সবার আগে নিজের শিকড়কে চিনতে হবে। নিজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ উপাদানকে ধারণ না করে কখনোই বিশ্বদরবারে স্বকীয়তা নিয়ে দাঁড়ানো যায় না। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অত্যন্ত মেধাবী। কিন্তু তারা এখন প্রকৃতির চেয়ে প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তারা সরাসরি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করার চেয়ে কম্পিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিনের ওপর বেশি নির্ভর করে। আমি মনে করি, তাদের প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া উচিত। প্রকৃতির সঙ্গে প্রযুক্তির একটা মেলবন্ধন হতে পারে; এমনটা আমি জাপানে দেখেছি। আমাদের এত সমৃদ্ধ লোকজ ঐতিহ্য রয়েছে, সেগুলোকে নতুন আঙ্গিকে তাদের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা উচিত।

আপনার কি কোনো বিশেষ স্মৃতির কথা মনে পড়ে, যা আপনি শেয়ার করতে চান?
আমরা যখন কাজ করতাম, তখন সবার মধ্যে একটা একতা ছিল। এখন তো প্রযুক্তির কারণে মানুষ অনেক দূরে চলে গেছে। তবে আমি মনে করি, তরুণ প্রজন্মকে বাংলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা উচিত। আধুনিকতার সাথে সাথে আমাদের শিকড়কেও মনে রাখতে হবে।

আরও পড়ুন

×