ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পরম্পরার পটচিত্র

পরম্পরার পটচিত্র
×

শম্ভু আচার্য

শম্ভু আচার্য

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

পট— শব্দটির আভিধানিক অর্থ কাপড়। আর ‘পটভূমি’ মানে হলো কাহিনি বা প্রেক্ষাপট। কাপড়ের ক্যানভাসে রং-তুলির আঁচড়ে যখন কোনো কাহিনি মূর্ত হয়ে ওঠে, তখনই তা হয়ে ওঠে পটচিত্র। আমি বংশপরম্পরায় পটশিল্পী বা পটুয়া। আমার পূর্বপুরুষেরা এই বাংলার মাটিতে পটচিত্র এঁকে আসছেন। আমি এই পরিবারের নবম পুরুষ। আমাদের পটচিত্র আঁকার পারিবারিক ইতিহাস প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুরোনো। এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলার ধুলো, মাটি, জল আর মানুষের জীবনের গল্পগুলোই আমাদের তুলির ডগায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

পটচিত্র কেবল বাঙালিদের নিজস্ব সম্পদ নয়, এটি একটি বৈশ্বিক আদিম শিল্পমাধ্যম। চীন, জাপান, কোরিয়ার মতো দেশগুলোতেও নিজস্ব ধারার পটচিত্র রয়েছে। তবে আমাদের বাংলাদেশে বাঙালি এবং আদিবাসী— উভয়ের মধ্যেই পটচিত্রের একটি নিবিড় ঐতিহ্য রয়েছে। একসময় এই পটচিত্রই ছিল বাংলার মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। রাজা-বাদশাহদের দরবার থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থের উঠোনে পটুয়ারা পট দেখিয়ে গান শোনাতেন। গাজীর গান, মহাভারত, মনসামঙ্গল, পদ্মপুরাণ কিংবা মহররমের কাহিনি— সবকিছুই পটের কাপড়ে চিত্রিত হতো। পটচিত্রের সঙ্গে বাংলার কৃষিজীবনের সম্পর্ক একেবারেই নাড়ির। একটি সময় ছিল যখন অগ্রহায়ণ বা বৈশাখে নতুন ধান উঠত, তখন এই পটের কদর যেত বেড়ে। তৎকালীন মহাজনরা হয়তো ১০-২০টা পট একসঙ্গে কিনে নিতেন। তারপর সেগুলো তুলে দিতেন গায়েনদের হাতে। 

গায়েনরা সেই পট নিয়ে চলে যেতেন বৃহত্তর সিলেট বা ময়মনসিংহের মতো ধানপ্রধান অঞ্চলে। সেখানে গেরস্থের বাড়িতে বাড়িতে গাজী পীর বা অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনির পট প্রদর্শন করে তারা গান গাইতেন। বিনিময়ে কৃষকেরা তাদের নতুন ধান বা চাল দিতেন। অর্থাৎ, শিল্পের সঙ্গে কৃষকের ফসলের এক অপূর্ব বিনিময় প্রথা চালু ছিল এই বাংলায়। এই পটচিত্র বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বলতম নিদর্শন। এখানে ধর্মের কোনো বিভেদ নেই। হিন্দু পটুয়ারা মহররমের পট আঁকছেন, আবার মুসলমান গায়েনরা পুরাণ বা গাজীর পট নিয়ে গান গাইছেন— এমনটাই ছিল বাংলার চিরায়ত রূপ। আগেকার দিনে গ্রামে যখন কলেরা বা মহামারির প্রাদুর্ভাব হতো, তখন হিন্দুরা শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর নগর কীর্তন বের করতেন, গান করতেন। অন্যদিকে মুসলমানরা করতেন জিকির। উভয়েরই উদ্দেশ্য ছিল এক— মানুষের আরোগ্য লাভ ও মঙ্গল কামনা। শিল্পের জায়গা থেকেও মানুষের এই বিশ্বাস ও মঙ্গল কামনার বিষয়টি পটে স্থান পেয়েছে। পটচিত্র একটি ধর্মনিরপেক্ষ শিল্প, যা সব মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে। চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ— বাঙালির এই দুটি সার্বজনীন উৎসবের সঙ্গেও পটচিত্রের গভীর সংযোগ রয়েছে। ছোটবেলায় গ্রামে দেখেছি, চৈত্রসংক্রান্তির দিনে গ্রামে গ্রামে ‘সং’ বের হতো। মানুষ নানা রকম মুখোশ পরে, সং সেজে নাচ-গান করত। কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের কাছে এই উৎসবগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। পহেলা বৈশাখ বা যেকোনো মঙ্গল অনুষ্ঠানে বাংলার নারীরা যে আলপনা আঁকেন, মঙ্গলঘট, কুলা বা পিঁড়ি চিত্রিত করেন, তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলার আসল প্রাণ। এই আলপনা বা মঙ্গল প্রতীকগুলো আমাদের লোকশিল্পেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা যুগের পর যুগ ধরে আমাদের শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক বাঁচিয়ে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পটচিত্রের রূপ ও রীতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। প্রাচীন পটচিত্রগুলো মূলত ‘এক চোখা’ বা প্রোফাইল (পাশ থেকে দেখা মুখ) স্টাইলে আঁকা হতো। এখনকার পটচিত্রে হয়তো পূর্ণাঙ্গ মুখাবয়ব বা আরও আধুনিক কিছু ছোঁয়া এসেছে। তবে আমাদের কাজের মূল ভিত্তি বা ব্যাকরণ সেই চিরায়ত লোকশিল্পের কাঠামোতেই দাঁড়িয়ে আছে। লোকশিল্পের একটা নিজস্ব শক্তি আছে, যা খুব দ্রুত মানুষের মনকে ছুঁতে পারে, আনন্দ দিতে পারে। একসময় যা ছিল কেবল গ্রামীণ বিনোদন, আজ তা আমাদের জাতীয় উৎসবগুলোর অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে একজন শিল্পী হিসেবে আমার কাজের ব্যাপ্তি বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বদরবারেও পৌঁছেছে, যা আমার জন্য চরম তৃপ্তির। আমার আঁকা পটচিত্র বর্তমানে কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়াম ও গুরুসদয় মিউজিয়াম, লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম এবং জাপানের ফুকুওকা এশিয়ান আর্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। এছাড়া চীনের সাংহাই ও কুনমিং শহরেও আমার পটের প্রদর্শনী হয়েছে। বাংলার কাদা-মাটির গন্ধমাখা একটি শিল্প যখন বিদেশের বড় বড় জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়, তখন তা কেবল আমার নয়, পুরো বাংলাদেশের সম্মান বয়ে আনে।

আমার দীর্ঘ শিল্পীজীবনে বেশ কিছু বড় কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে, যার মধ্যে দুটি কাজের কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। একটি হলো— ‘স্বাধীনতার পট’। এটি ২৪টি খণ্ডের একটি বিশাল পটচিত্র। ১৯৫৭ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের যে দীর্ঘ সংগ্রাম, তারই চিত্ররূপ এই পট। আমার আরেকটি বড় কাজ হলো— ‘সমুদ্র মন্থন’। এটি দৈর্ঘ্যে ১০০ ফুট এবং প্রস্থে ৮ ফুট। এই বিশাল পটচিত্রটি আঁকতে আমার প্রায় দেড় বছর সময় লেগেছে। এই কাজটির সমাপ্তি ঘটেছে খুব বেশিদিন হয়নি, ২০২২ সালের দিকে। তবে আমার ভেতরে একটা ছোট আক্ষেপ বা অপেক্ষা রয়ে গেছে। দীর্ঘ সাধনার ‘স্বাধীনতার পট’ এবং ‘সমুদ্র মন্থন’— এই দুটি বড় কাজের কোনোটিরই এখন পর্যন্ত কোনো প্রদর্শনী হয়নি। স্বাধীনতার পটটি বর্তমানে একটি সংরক্ষিত জায়গায় নিরাপদে রাখা আছে বটে, কিন্তু মানুষের সামনে এটি তুলে ধরার একটি সুযোগ আমি প্রত্যাশা করি। নতুন কাজের ক্ষেত্রে খুব বেশি পূর্বপরিকল্পনা করে এগোই না। আমি শিল্পের মানুষ, আমার যখন যা মনে আসে, তাই করি। আমি বিশ্বাস করি ‘মাঠের ভাও’ বা পরিস্থিতির স্বাভাবিক গতির ওপর। আমার কাজ হলো শুধু এঁকে যাওয়া। যখন যে বিষয়ের ডাক আমার ভেতর থেকে আসে, আমি শুধু তুলি হাতে তা ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি। কাজই আমাকে রাস্তা দেখিয়ে দেয়। কর্মই আমাকে ইঙ্গিত করে। সাড়ে চারশো বছরের যে ঐতিহ্য আমার ধমনিতে বইছে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই শেকড়ের গল্পই রঙের ভাষায় বলে যেতে চাই। 

অনুলিখন :: শাহেরীন আরাফাত

আরও পড়ুন

×