তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় ফেরার পথ খুলল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৭ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এর ফলে সংবিধানের মাধ্যমে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট ফেরার পথ তৈরি হলো বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ গতকাল বৃহস্পতিবার চারটি আপিল খারিজ করে সংক্ষিপ্ত এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হলেন– বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি এস. এম. এমদাদুল হক।
২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ওই বছরের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী আইন সংসদে পাস হয়।
গতকাল আপিল বিভাগের রায়ের পর আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে। এটা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।’
রায়ের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ জামায়াতের পক্ষ থেকে যে আপিল করা হয়েছিল, সেগুলো নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। অর্থাৎ হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকল।
রায়কে স্বাগত জানিয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক সমকালকে বলেন, রায়ে অন্য যে বিষয়গুলো রয়েছে, তার ব্যাপারে সংসদকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি বলেন, এখন আগের তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল হবে কি হবে না; কোন প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন হবে; তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাদের সমন্বয়ে গঠিত হবে; কে প্রধান হবেন; তাদের মেয়াদ কত দিন থাকবে; তাদের দায়িত্ব কী হবে– এসব বিষয়-সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী আইন সংসদে পাস করতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, প্রতিস্থাপন ও পরিবর্তন-পরিমার্জন করেছিল। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর এই সংশোধনী বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন ড. বদিউল আলম মজুমদার, তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজ উদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান। রুল শুনানির পর্যায়ে আদালতকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য যুক্ত হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এ মামলায় যুক্ত হয়। রুল জারির পর চূড়ান্ত শুনানি শেষে ওই বছর ১৭ ডিসেম্বর রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। রায়ের পর সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট ফিরে আসে।
পরে ৩ নভেম্বর ওই রায় পুরো বাতিল চেয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন রিট মামলার বাদীপক্ষ ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ চার বিশিষ্ট ব্যক্তি। পাশাপাশি নওগাঁর বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়ে আলাদাভাবে আপিল করেন। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আরেকটি আপিল করেন এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি নামে একটি সংগঠন লিভ টু আপিল করে শুনানিতে অংশ নেয়। টানা তিন দিন চারটি আপিলের ওপর আইনজীবীদের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয় গত বুধবার। এরপর গতকাল আপিল বিভাগ যে সিদ্ধান্ত দিলেন, তাতে হাইকোর্টের রায়ে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বলেন, হাইকোর্ট বিভাগ চারটি বিষয়ের ওপর পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য– নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে আসা, গণভোট ফিরে আসা এবং সংবিধানের ৭-এর ‘ক’, ৭-এর ‘খ’ এবং সুপ্রিম কোর্টের যে রিটের যে ক্ষমতা, সেই ক্ষমতা। এখন এই রায়ের ফলে হাইকোর্টের সেই রায়টি বহাল থাকল। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে এলো। আর বাকিগুলো এখন সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
আদালতে সুজন সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী কারিশমা জাহান ও রেদুয়ানুল করিম। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষে ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিক এবং মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির ছিলেন। ইন্টারভেনার বা তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যুক্ত একটি সংগঠনের পক্ষে আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক এবং ইন্টারভেনার হিসেবে আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ শুনানিতে অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
প্রতিক্রিয়া
রায়ের পর সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রায়ের বিস্তারিত বা পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পরই অসন্তুষ্টির বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান ফিরে আসতে কোনো বাধা রইল না। পঞ্চদশ সংশোধনীর রায়ে হাইকোর্ট চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, যা আপিল বিভাগে বহাল থাকল। যে বিষয়গুলো অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল সংবিধানের কিছু মৌলিক বিষয় পরিবর্তন বা সংশোধন করলে তা ‘সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে গণ্য হওয়ার বিধান, গণভোটের বিধান বাতিল, নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল। বাকি বিষয়গুলো জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, এ রায়ের ফলে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে কিছু আইনি ও টেকনিক্যাল জটিলতা বা স্ববিরোধিতা তৈরি হয়েছে, যার সুরাহা সংসদকেই করতে হবে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। তখন প্রয়োজনে রিভিউ আবেদন করা হতে পারে।
শরীফ ভূঁইয়া বলেন, হাইকোর্টের রায়ে সব বিধান বাতিল হয়নি। কিছু বিধান আরও বাতিল করা প্রয়োজন ছিল। যেমন– উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার শপথ গ্রহণ-সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে ফিরে আসেনি। বিচারপতিরা উপদেষ্টা বা প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে পারবেন– এ বিষয়ে একটি বিধান ছিল, সেটিও ফিরে আসেনি। তা ছাড়া জাতীয় সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিন আগেই নির্বাচন করতে হবে– পঞ্চদশ সংশোধনীর এ বিধান যদি বহাল থাকে, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব নয়। কারণ, যেহেতু সংসদ ভেঙে দেওয়ার আগেই নির্বাচন করতে হচ্ছে, তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যা সংসদের মেয়াদ শেষে গঠিত হওয়ার কথা, তা গঠন করা যাচ্ছে না। কাজেই এখানে একটি বড় সাংঘর্ষিক বা স্ববিরোধিতা রয়েছে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসছে। নির্বাচনী সংস্কৃতিতে এটি ইতিবাচক পরিবর্তন।
সুজনের জাতীয় কমিটির সদস্য আবেদনকারী মো. জুবাইরুল হক ভূঁইয়া বলেন, এ রায় দেশের দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালত কোনো নির্দেশ দিতে পারবেন না বলে বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি– জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়। জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০-এ উন্নীত করা হয়। অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও যুক্ত করা হয় এই সংশোধনীতে। পাশাপাশি সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
হাইকোর্টের রায়
গত বছরের ৮ জুলাই প্রকাশিত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, পঞ্চদশ সংশোধনী আইনটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি, বরং বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন বা পরিবর্তন করতে পারবে।
হাইকোর্ট তার রায়ে বলেন, আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পরবর্তী দুই মেয়াদের জন্য বহাল রাখার যে আদেশ দিয়েছিলেন, তৎকালীন সরকার ও আইনপ্রণেতারা তা ‘সম্পূর্ণ উপেক্ষা’ করেছিলেন, যা আদালতের আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচনব্যবস্থাকে ‘দলীয়করণের’ মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ‘গণতন্ত্র’ ও ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব’ ধ্বংস করা হয়েছে।
রায়ে বলা হয়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল ‘সাধারণ মানুষের ঐকমত্য এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবির ফসল’ হিসেবে। এই ব্যবস্থা বাতিলের ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার ‘হরণ’ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত জুলাই-অগাস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।
পর্যবেক্ষণে ৭ (ক) অনুচ্ছেদ সম্পর্কে আদালত বলেন, অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তির যে বিধান যুক্ত করা হয়েছিল, তা অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং ‘ভিন্নমত দমনের’ একটি হাতিয়ার। এটি নাগরিকদের বাকস্বাধীনতার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে।
৭ (খ) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি চিরতরে সংশোধন অযোগ্য করার বিষয়টিকে আদালত ‘সংবিধান পরিপন্থি’ বলে সিদ্ধান্ত দেয়। কারণ এটি ভবিষ্যৎ সংসদের ক্ষমতা খর্ব করার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতাকেও বাধাগ্রস্ত করে।
এ ছাড়া ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ বাতিল করার যুক্তিতে আদালত বলেন, হাইকোর্টের ক্ষমতা অন্য কোনো আদালতকে দেওয়ার বিধানটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের ক্ষেত্রে ‘চরম তাড়াহুড়ো’ করা হয়েছিল। সংসদীয় বিশেষ কমিটিকে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ করার দায়িত্ব দেওয়া হলে তারা প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে সর্বসম্মত সুপারিশ করেছিল।
- বিষয় :
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার