ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ হবে ‘লুটপাটের লাইসেন্স’: জামায়াত

জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ হবে ‘লুটপাটের লাইসেন্স’: জামায়াত
×

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৪১ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৫৪

বেসরকারি কোম্পানিকে অকটেন-পেট্রোলের মতো পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দিতে সরকার যে নীতিমালা করতে যাচ্ছে, তাকে লুটপাটের লাইসেন্স বলে আখ্যা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। 

শনিবার রাজধানীর মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলটির নেতারা বলেছেন, জামায়াত বাজার অর্থনীতির বিরোধী নয়। বেসরকারি বিনিয়োগকে স্বাগত জানায়। তবে সরকার রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভেঙে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন বেসরকারিকরণ করছে, তা শেষ পর্যন্ত কয়েকটি প্রভাবশালী কোম্পানির সিন্ডিকেটে পরিণত হবে। জ্বালানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে কোম্পানির হাতে। গত ২ আগস্ট বাঙ্কারিং নীতিমালায় পরিবর্তন এনে মেরিন ফুয়েল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা দেশে পরিশোধন করে বিক্রি করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানিও অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। তারা তা পরিশোধন করে বিপিসির কাছে বিক্রি করে। পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল, কেরোসিন, ফার্নেস অয়েলের মতো জ্বালানি তেল সরকার নির্ধারিত দামে বিপিসি ডিলারের মাধ্যমে বিক্রি করে সাধারণ ভোক্তার কাছে।

সম্প্রতি বসুন্ধরা গ্রুপ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে তা সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রির সুযোগ চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করে। এর পরপরই সরকার জ্বালানি সচিব এবং বিপিসি চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেয়। 

‘সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ’ নিয়ে জামায়াতের বক্তব্য তুলে ধরেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, জ্বালানি খাত সংস্কারের বদলে এর নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার খরচ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, নতুন বিপিসি চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার চার দিনের মধ্যে নীতিমালার খসড়া তৈরির নির্দেশ দেওয়ার উদ্দেশ্য প্রতিযোগিতা নয়, দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স দেওয়া।

বেসরকারি কোম্পানিকে আমদানির সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম কমবে—সরকারের এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘এ ব্যবসায় গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও বিপুল ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে বাস্তবে হাতেগোনা কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীই এ বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা রাখে। এতে একচেটিয়া বেসরকারি নিয়ন্ত্রণ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।’

বিপিসিকে অদক্ষ ও লোকসানি দেখিয়ে বেসরকারিকরণের যুক্তিও প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াত। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি যথাক্রমে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা লোকসান করেছিল।

জামায়াতের দাবি, বর্তমান জ্বালানি সংকটও বিপিসির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা নয়। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও দেশে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে দাম না বাড়ানোর কারণে বিপিসি প্রতিদিন প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে বলে জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটকে কাজে লাগিয়ে সরকার তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়ে দরদাতা সংকট, বেশি দাম ও সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দ্রুততা আর স্বচ্ছতা পরস্পরবিরোধী নয়। কিন্তু এখানে দ্রুততার নামে স্বচ্ছতাই বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। দরপত্রের সময়সীমা কমিয়ে ১০ দিন করার কারিগরি ভিত্তি কী—প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল। 

জ্বালানি তেলকে সাধারণ পণ্য নয়, বরং কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, বিমান চলাচল ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছে জামায়াত। বাংলাদেশের একমাত্র তেল শোধনাগার—ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) সীমিত মজুত সক্ষমতা উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘যুদ্ধ বা দুর্যোগের সময় বেসরকারি কোম্পানিকে রাষ্ট্র কীভাবে নির্দেশ দেবে? সরকার কখনো কখনো ভর্তুকি দিয়ে তেল বিক্রি করে। বেসরকারি কোম্পানি কি ভর্তুকি দিয়ে দুর্গম এলাকায় তেল পৌঁছে দেবে?’

জামায়াত সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের কাছে চার প্রশ্ন রেখে জানতে চেয়েছে, ‘‘কোম্পানি যদি বলে ‘লাভ হচ্ছে না, তেল আনব না’ তখন কী হবে? প্রত্যন্ত চর, হাওর, পাহাড়ে অলাভজনক রুটে তেল পৌঁছাবে কে? বেসরকারি কোম্পানি কি বিপিসির মতো লোকসান দিয়েও তেল বিক্রি করবে? গোলাম পরওয়ার বলেন, বেসরকারি আমদানিকারক এলে ভোক্তাপর্যায়ের দাম কে নির্ধারণ করবে? সরকার না কোম্পানি?’’ 

গোলাম পরওয়ার বলেন, জ্বালানি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হওয়ায় এটি মুনাফার খাত না করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে সীমিত মুনাফায় পরিচালনা করাই জনস্বার্থসম্মত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানার মূল্যায়ন তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের এখনও বেসরকারি ব্যবস্থায় যাওয়ার সময় হয়নি। বেসরকারি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিলে এলপিজি খাতে যা ঘটেছে, তারই পুনরাবৃত্তি হতে পারে জ্বালানি তেলে। বেসরকারি সিন্ডিকেটের দাপটে সাধারণ মানুষ সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি কিনতে পারে না।

জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, ‘পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই মাস আগে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল বিক্রির নীতিমালা করেছিল এবং সুবিধা পেয়েছিল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী। আবার যদি একই মডেল ফিরে আসে, তাহলে জুলাইয়ের রক্তের অর্থ কী ছিল?’  

জামায়াত নীতিমালা স্থগিতসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছে। গোলাম পরওয়ার বলেন, খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করে অন্তত ৬০ দিনের জনমত গ্রহণ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে উন্মুক্ত শুনানি করতে হবে। বেসরকারিকরণের বদলে বিপিসির সংস্কার করতে হবে।

জামায়াত স্বাধীন নিরীক্ষা, বিপিসির বোর্ডে পেশাদারদের নিয়োগ, ক্রয়ে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণ প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট ও কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির আ ন ম শামছুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি প্রমুখ।

আরও পড়ুন

×