৬০ বছরের রাখালিয়া টেকনাফের কালামিয়া
সারবাংয়ের সাগর তীরের বালুচরে গরু চরাচ্ছেন সত্তরোর্ধ্ব কালামিয়া সমকাল
আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৫ | ০০:১১
কালামিয়ার বাড়ি টেকনাফ সীমান্তের সাবরাংয়ের কাটা বনিয়া গ্রামে। বয়স এখন প্রায় ৭২। ৬০ বছর ধরে তিনি একটিই কাজ করে আসছেন। সেটি হলো সাগর তীরের তৃণভূমিতে গরু চরানো। মজুরির বিনিময়ে তিনি গৃহস্থের গরু চরান। ছয় দশকে একডজন গৃহস্থের গরু চরিয়েছেন। এই জীবন সায়াহ্নেও তিনি এ কাজটিই করেন। প্রতিদিন ভোরে কাঁধে গামছা, হাতে বাঁশের লাঠি আর একটি পলিথিন নিয়ে গরুর দল নিয়ে মাঠে ছুটেন তিনি।
রাখাল কালামিয়া বলেন, “গরুর চোখের দিকে তাকালে মনে হয় ওরা কথা বলছে আমার সঙ্গে। আমি প্রতিটি গরুর নাম রেখেছি। কেউ ‘ধইল্ল্যা’, কেউ ‘কালু’, কেউ ‘সোনামণি’। নাম ধরে ডাকলেই আমার দিকে ছুটে আসে। কোনো গরু অসুস্থ হলে রাত জেগে থাকি। একবার এক গরু পায়ে আঘাত পায়। তখন আমার নিজের ওষুধ গরুকে খাইয়ে দিই। বিষয়টি সঠিক না হলেও আমার গরুর আঘাত ভালো হয়ে গিয়েছিল।”
মাত্র ১২ বছর বয়সে ২০ টাকায় রাখালের কাজ শুরু করেন কালামিয়া। এখন মজুরি পান ৫-৬ হাজার টাকা। তবে তিনি নিজেও প্রতিবছর দুটি ছোট গরু কিনে পালন করেন। বড় করে বিক্রি করে ভালো একটা লাভ পান। সুযোগ থাকলেও অন্য কোনো পেশায় যাওয়ার চেষ্টা করেননি। এই কাজ করতে গিয়ে গরুর প্রতি অন্যরকম একটা ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন ভোরে গরুর গায়ে হাত বোলাতে ভালো লাগে তার।
টেকনাফের সাগর তীরে গরু চরানো একটি জনপ্রিয় পেশা। অসংখ্য গরুর পাল বছরের সাত-আট মাস বালুচরে বেড়ায়। গরু পালন ও লালনে রাখালদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, থাকতে হয় কষ্টকর পরিবেশে। কালামিয়ার জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে টেকনাফের সাবরাংয়ে সাগর তীরে
বালুচরে। বালুচরে জন্ম নেওয়া নানা ধরনের তৃণ গরুর পছন্দের খাবার। সম্প্রতি কথা হয় কালামিয়ার সঙ্গে। শরীরে জ্বর নিয়ে তিনি মাঠে ছুটে এসেছেন গরু নিয়ে, গায়ে একটি পলিথিন দিয়ে গা মোড়ানো। তিনি বলেন, ‘বাবার আয় ছিল সামান্য। সংসারে কিছুটা সহায়তার জন্য রাখালের কাজ শুরু করেছিলাম। তখন ভাবিনি, এই পেশাই হয়ে উঠবে আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুরুতে অভাব ছিল, পরে গরুর সঙ্গে মায়া জমে গেল, তাই এই পেশা ছাড়তে পারিনি।’
কালামিয়া জানান, একাধিকবার অন্য পেশায় যাওয়ার সুযোগ এসেছিল। আত্মীয়-স্বজনও বলেছিলেন, ছেলে-মেয়ে বড় হয়েছে, এখন দোকান দাও, একটু আরাম করো। কিন্তু পেশা বদল করেননি। তিনি বলেন, ‘ আরাম যদি চাইতাম, তাহলে এই কাজ করতাম না। আমি চাই শান্তি। আর শান্তি পাই এই মাঠে, গরুগুলোর সঙ্গে। আসলে গরুগুলোকে আমার নিজের সন্তান মনে হয়। কখন কষ্টে আছে, না খেয়ে আছে, আমি ঠিকই বুঝতে পারি। এমনকি আমি সকালে একবেলা খেয়ে বের হই, তা দিয়ে সারাদিন পার করি।’
গ্রামবাসীর চোখে তিনি একজন প্রেরণাদায়ী মানুষ। স্থানীয় তরুণরাও মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে মাঠে যান, গরু পালনের কৌশল শেখেন। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, ‘কালা চাচা আমাদের কাছে শুধু রাখাল নন, তিনি একজন ভালোবাসার মানুষ। গরুরু প্রতি রাখালের এমন মায়া, দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠা সমাজের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’
টেকনাফ সাবরাং কাটাবনিয়ার ইউপি সদস্য কবির আহমেদ বলেন, ‘যে সমাজে দিনে, সপ্তাহে পেশা বদল হয়, সেখানে একটা মানুষ ৬০ বছর একই কাজ করেন এটা অবিশ্বাস্য।
আমি বলব এটা তার পেশা নয়, মায়াজালে বন্দি হয়েছেন তিনি। আমাদের এলাকায় অনেকে পরের গরু চরিয়ে সংসার চালান। কিন্তু অনেকে কয়কে বছরের মধ্যে পেশা বদল করেন। তবে কালা মিয়া চাচার গল্পটা ভিন্ন। আমাদের সবার উচিত এমন মানুষের পাশে দাড়াঁনো।’
- বিষয় :
- সাগরিকা
