৩৮৬ বছরের ঐতিহ্য ‘ঈদ মেজবানি’
ভাটিয়ারী এলাকার শতবর্ষী জানে উল্ল্যাহ মুন্সি বাড়ি মসজিদ সমকাল
এম সেকান্দর হোসাইন, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রাচীনকালে সীতাকুণ্ডে এখানকার মতো এত মসজিদ ছিল না। তাই দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা ঈদের নামাজ আদায় করতে আসতেন ভাটিয়ারী এলাকার জানে উল্ল্যাহ মুন্সি বাড়ি মসজিদে। ঈদ ঘিরে এই মসজিদে মুসল্লিদের আপ্যায়ন করার রীতি চলে আসছে শত বছর ধরে। ঈদের চাঁদ দেখা গেলে মসজিদের পাশের পুকুর থেকে মাছ ধরা হতো এবং গরু-ছাগলের মাংস রান্না করে মুসল্লিদের আপ্যায়ন করা হতো। সময়ের পরিক্রমায় সেই আতিথেয়তায় যোগ হয়েছে ‘ঈদ মেজবানি’। মুন্সি বাড়ির বাসিন্দা তরুণ রিপন জানালেন, এবার ঈদেও ৬টি বড় গরু জবাই করে প্রায় ৮ হাজার মুসল্লি ও স্থানীয়দের মেজবানি খাওয়ানো হয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, শত বছর ধরে নয়, প্রায় ৩৮৬ বছর ধরে জানে উল্ল্যাহ মুন্সি বাড়ি জামে মসজিদে মুসল্লিদের খাওয়ানো তথা মেজবানির রীতি চলে আসছে। বংশপরম্পরায় ঈদ মেজবানি এখন শুধু পারিবারিক আয়োজন নয়, বরং পুরো এলাকার জন্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে ইরাক থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসে ভাটিয়ারী এলাকায় বসতি স্থাপন করেন জানে উল্ল্যাহ মুন্সি (রহ.)। তখন এলাকাটি ছিল মগ ও হিন্দু অধ্যুষিত। তাঁর আগমনের পর ধীরে ধীরে এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠিত হয় জানে উল্ল্যাহ মুন্সি (রহ.) জামে মসজিদ, রাস্তা, ঘাট ও পুকুর। পরে এলাকায় আরও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিস্তৃতি ঘটে।
সে সময় বঙ্গোপসাগরের উপকূলঘেঁষা ছোঁয়াখালী খাল দিয়ে দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ীরা যাতায়াত করতেন। খালের প্রথমাংশে প্রতি সপ্তাহে বসত হাট, যা ‘ভাটি-গঞ্জ’ নামে পরিচিত ছিল। এখনও সেই খালটি জানে উল্ল্যাহ মুন্সি জামে মসজিদের পাশে প্রবহমান।
মসজিদ কমিটির সভাপতি শিল্পপতি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘জানে উল্ল্যাহ মুন্সি (রহ.) ইরাক থেকে এসে এই এলাকার মানুষকে শিখিয়েছেন– মেজবানি শুধু খাবার নয়, এটি ভালোবাসা, সম্মান ও একতার প্রতীক। ধীরে ধীরে এই ঐতিহ্য আশপাশের এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে।’ সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরিদুল আলম বলেন, ‘এবার ঈদে ৪০ মণ মাংস, ৭৫০ কেজি আলু ও ৩০০ কেজি ছনার ডাল দিয়ে মেজবানি আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রায় ৮ হাজার মানুষকে আপ্যায়ন করা হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অতিথিরা এই আয়োজনকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন। মেজবানিতে মানুষের আনন্দ আমাদের মনে করিয়ে দেয়– আতিথেয়তা মানে শুধু পেট ভরানো নয়, হৃদয় ভরানো।’
একই ইউনিয়নের নাছির মোহাম্মদ চৌধুরী বাড়ি জামে মসজিদেও দীর্ঘদিন ধরে ঈদ মেজবানির ঐতিহ্য চলে আসছে। এ বাড়ির বাসিন্দা ও ভাটিয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আনোয়ার বলেন, ‘শত বছর ধরে আমাদের মসজিদ বাড়িতে সম্মিলিতভাবে ঈদ মেজবানি হয়ে আসছে। পূর্বপুরুষদের স্মরণে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। এবার ঈদে দুই হাজার অতিথিকে মেজবানি খাওয়ানো হয়েছে।’
- বিষয় :
- ঐতিহ্য
