পাহাড়ের পথপ্রদর্শক সুচরিতা চাকমা
সুচরিতা চাকমা সমকাল
সত্রং চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন সুচরিতা চাকমা। নিজের প্রতিষ্ঠান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রোগ্রেসিভের মাধ্যমে তিনি পাহাড়ি নারী ও শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন। পাশাপাশি নারী হেডম্যান ও কার্বারিসহ (প্রথাগত প্রধান) সাড়ে ৪০০ নারীর অংশগ্রহণে নারীর ক্ষমতায়ন ও বিচারিক অধিকার নিয়ে কাজ চলছে। তিনি চার হাজার নারীকে হস্তশিল্প, পশুপালন, স্মার্ট কৃষি, সেলাই, বুটিকস, ড্রেস মেকিং, স্কিন প্রিন্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা পরিবার ও সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। সংস্থাটির মাধ্যমে ইতোমধ্যে ১০৪ জন নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে।
রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন সুচরিতা চাকমা। পারিবারিক আর্থিক অসচ্ছলতা সত্ত্বেও তিনি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কুন্ডেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মাধ্যমিক পাসের পর বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হলেও লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ থেকে তিনি পরবর্তীতে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
শুরুতে তিনি রাঙামাটিতে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প (পিনোন-হাদি) নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। অল্প পুঁজিতে শুরু করা এ উদ্যোগে একসময় ৩৬ জন কর্মচারী কাজ করতেন। তবে নকল পণ্যের প্রভাব বাড়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। এরপর তিনি নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণ ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।
এই লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৭ সালে ‘প্রোগ্রেসিভ’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। শুরুতে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়লেও ২০০৮ সাল থেকে মাত্র চারজন কর্মী নিয়ে পূর্ণমাত্রায় কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে সংস্থাটিতে ১০৪ জন কর্মী কাজ করছেন, যার মধ্যে নারী ৬৩ জন এবং পুরুষ ৪১ জন। রাঙামাটির পাশাপাশি বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতেও সংস্থাটির শাখা রয়েছে।
এ ছাড়া সংস্থাটি জলবায়ু পরিবর্তন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, পুষ্টি, নারী নিরাপত্তা, নারী-শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং ভিকটিম নারীদের আইনি ও পারিবারিক সহায়তা প্রদান করছে। ইতোমধ্যে তিনজন ভিকটিম নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগও করে দেওয়া হয়েছে।
সংস্থার নিজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১২ জন নারীর তৈরি পণ্যের দুটি আউটলেট শোরুম চালু রয়েছে। পাশাপাশি আদিবাসী সংস্কৃতি সংরক্ষণে পিনোন-হাদি ও অন্যান্য হস্তশিল্প উৎপাদনে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের নেতৃত্বে এগিয়ে আনতেও কাজ করছে প্রোগ্রেসিভ। চাকমা রাজ সার্কেলের অধীনে থাকা ২৩০ জন নারী কারবারী ও হেডম্যানকে অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে বাড়িয়ে ৪৫০ জনে উন্নীত করা হয়েছে। এর ফলে কমিউনিটি পর্যায়ে নারীদের বিচারিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে।
সুচরিতা চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ে নারীরা এখনও পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীরা এগোতে পারছে না। বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমে এক ধরনের অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে, যেখানে নারীবাদকে অন্যদিকে নেওয়া হচ্ছে। নারীরা কম অধিকার পাচ্ছে– এ বিষয়টি অনেক পুরুষ উপলব্ধি করছে না। তবে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করা গেলে এই বৈষম্য ও সংঘাত কমে আসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নারীদের এগিয়ে নিতে হলে তাদের সুযোগ ও স্বাধীনতা দিতে হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে নারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে যে কোনো নারী নিজের অবস্থান থেকে দাঁড়াতে পারবে।’
- বিষয় :
- পাহাড়
