ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৫০০ মিটার ভুলুয়া নদীর ৪০০ মিটারই বেদখলে

৫০০ মিটার ভুলুয়া নদীর  ৪০০ মিটারই বেদখলে
×

শুকিয়ে গেছে লক্ষ্মীপুরের ভুলুয়া নদী। যেখানে অল্প পানি আছে, সেখানে বাঁধ দিয়ে চলছে মাছ চাষ সমকাল

 আতোয়ার রহমান মনির, লক্ষ্মীপুর

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

দখল, দূষণে মৃতপ্রায় লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্যবাহী ভুলুয়া নদী। একসময় প্রায় ৫০০ মিটার প্রশস্ত ছিল এই নদী। বর্তমানে প্রস্থ নেমে এসেছে ৮৫ মিটারে। ৪০০ মিটারের বেশি দখল ও ভরাট হয়ে গেছে। এই নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রতি বর্ষায় এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। 

একসময় বড় নৌকা চলাচল করত নদীতে। মাছ ধরেই বহু জেলে পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু বছরের পর বছর নদীতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, বাঁধ তৈরি, দূষণ ও মাটি জমার কারণে নদীর প্রস্থ অনেক জায়গায় মাত্র ৮৫ মিটারে পৌঁছেছে। শুষ্ক মৌসুমে নদী হেঁটেই পার হওয়া যায়। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ-উজ-জামান খান বলেন, ‘বৃহত্তর ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা ও বন্যা নিরসনে একটি প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে। প্রকল্পটি এখন অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। ওই প্রকল্পে ভুলুয়া নদী খননকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।’
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থেকে লক্ষ্মীপুর সদর, কমলনগর ও রামগতি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রায় ৭১ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে ভুলুয়া নদী। 
চরকাদিরা এলাকার সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান নুরুল্লাহ খালেদ জানান, নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে এলাকার পানি নামতে পারে না। এক বা দুই বছর পর্যন্ত জলাবদ্ধতা থাকার কারণে জমিতে ফসল আবাদ করা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, ‘নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ, তীর দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ ও ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে বাড়ির সামনে নদীর অংশকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে বাঁধ দিয়ে রেখেছেন। ফলে বর্ষা এলেই চরকাদিরা, আন্ডারচর ও তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নের হাজার হাজার একর জমি জলাবদ্ধ হয়ে থাকে। এতে ইরি-বোরো চাষ ব্যাহত হয়ে প্রায় তিন হাজার হেক্টর ফসলি জমি পতিত পড়েছে।’

স্থানীয় কৃষক সবুজ হোসেন, তাজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান বলেন, ‘একসময় ভুলুয়া নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে স্থানীয়রা জীবিকা নির্বাহ করতেন। নদীতে নৌকা চলাচল করত। কিন্তু বর্তমানে প্রভাবশালীরা নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণসহ নানা উপায়ে নদীটি দখল করে রেখেছেন।’
কমলনগরের সাংবাদিক সুমন উদ্দিন বলেন, ‘ভুলুয়া নদীতে পানি না থাকায় কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ইরি-বোরো চাষ ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রায় তিন হাজার হেক্টর ফসলি জমি খালি পড়ে আছে। অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে দ্রুত উচ্ছেদ ও নদী খননের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
চর কাদিরা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নিজাম উদ্দিন জানান, নদী খননের অভাব এবং অবৈধ দখলদারদের কারণে এ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাজারো কৃষক। স্থানীয় প্রশাসনকে বারবার অবহিত করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাইন উদ্দিন পাঠান বলেন, ‘ভুলুয়া নদীর খনন ও সংস্কার হলে এ অঞ্চলের কৃষিকাজে আমূল পরিবর্তন আসবে এবং হাজারো কৃষকের ভাগ্য বদলে যাবে। নদীর আগের জোয়ার-ভাটার রূপ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের সুদৃষ্টি জরুরি।’
কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাহাত উজ জামান বলেন, ‘অবৈধ দখলদার যেই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুলুয়া নদীর প্রমত্ত রূপ ফিরিয়ে আনতে একটি পৃথক প্রকল্প গ্রহণ জরুরি।’

আরও পড়ুন

×