সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটছেন প্রভাবশালীরা
সীতাকুণ্ডের বিএমএ গেট সংলগ্ন এলাকায় পাহাড় কাটা হচ্ছে প্রকাশ্যে, তবু জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না সমকাল
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সীতাকুণ্ডে একের পর এক পাহাড় কাটা হচ্ছে। রাতের আঁধারে বিক্রি হচ্ছে পাহাড় কাটা মাটি। জড়িত প্রভাবশালীরা হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি টাকা। পাহাড়ি ছড়া ভরাট করে রাস্তা, ইটভাটা ও কারখানা নির্মাণ করছে একটি শিল্প গ্রুপ। স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সাধারণ মানুষ পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় মিথ্যা মামলার আসামি ও গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ, গণহারে পাহাড় কাটার ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। ২০১৬ ও ২০১৯ সালে জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড়ধসের ঘটনায় একাধিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। সামনের বর্ষায় কাটা পাহাড়ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এতে আবার মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাহাড়ে থাকা গাছ, পাখি, বন্যপ্রাণী ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থলও ধ্বংস হবে।
মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভাটিয়ারী-হাটহাজারী লিংক রোডে মীর গ্রুপ পাহাড় কাটছে। অভিযোগ রয়েছে, পাহাড়ি ছড়া ভরাট করে রাস্তা, ইটভাটা ও কারখানা নির্মাণ করছে শিল্প গ্রুপটি। পাহাড় কাটার জন্য একটি এক্সক্যাভেটরও ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মীর গ্রুপের ব্রিকস ফিল্ডের ম্যানেজার তাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘আমি কখনও মিথ্যা কথা বলি না, এখানে কোনো পাহাড় কাটা হচ্ছে না। সাংবাদিকরা মিথ্যা কথা বলছে, আমি তা কখনও মেনে নেব না।’
সীতাকুণ্ড ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, শত শত বছর ধরে দৃশ্যমান এই পাহাড়ের দক্ষিণাংশের ৮ একর জায়গা ভূমি শ্রেণিতে রূপান্তর করা হয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, অনিয়মের মাধ্যমে পাহাড়কে ভূমি শ্রেণিতে রূপান্তর করে ইট তৈরির আয়োজন চলছে। পাহাড়ের মাটি দিয়ে ছড়া ও জলাধার ভরাট করা হচ্ছে, এতে ঝরনা ও ছড়া শুকিয়ে যাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির উৎস কমছে। পাহাড় ও বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় এলাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বাতাসের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত ও আবহাওয়ার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
উপজেলার বাড়বকুণ্ড উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের পাশেও একের পর এক পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট পাহাড় কেটে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সম্প্রতি তিনটি মাটি ভর্তি ট্রাক জব্দ করেছে পুলিশ। সীতাকুণ্ড মডেল থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মোহাম্মদ আলমগীর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ঘটনায় পুলিশের সার্জেন্ট মো. মাজাহারুল বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, ‘পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষেধ। কেউ অবৈধভাবে এ কাজ করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ আশরাফ জানান, আগে ভাটিয়ারীতে অভিযান চালিয়ে পাহাড় কাটার যন্ত্রপাতি জব্দ করা হয়েছে এবং একজনকে জেল দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তাদের নজরদারিতে রয়েছে।
এদিকে, স্থানীয়রা দাবি করছেন, পরিবেশ রক্ষার জন্য পাহাড় কাটা রোধ করলে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধ। সীতাকুণ্ড মডেল থানার এসআই আবুল হোসেন জানান, রোববার রাতে ভাটিয়ারী এলাকার কফিল ও ওয়াসিমকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আটক কফিলের স্ত্রী জেমু আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী পরিবেশ রক্ষার জন্য পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা করা হয়েছে। আমরা চাই, প্রকৃত ঘটনা যাচাই করে পাহাড় কাটা বন্ধ ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হোক।’
- বিষয় :
- পাহাড়
