যুদ্ধের ৫৫ দিনে ৩৩৮ ফ্লাইট বাতিল
গত ১ এপ্রিল থেকে চট্টগ্রামে নতুন দুটি ফ্লাইট চালু করেছে ফ্লাই দুবাই। এতে যাত্রীদের আশার সঞ্চার হয়েছে সমকাল
সারোয়ার সুমন
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘যুদ্ধের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই নেই। কিন্তু যুদ্ধের কারণেই দুবাইয়ে সেলসম্যানের চাকরিটা আমি হারালাম। কোম্পানি থেকে ছুটি নিয়ে এক মাসের জন্য দেশে এসেছিলাম। ১ এপ্রিল দুবাই ফেরার কথা ছিল। এয়ারপোর্টে এসে শুনি, যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট বাতিল। কোম্পানিকে বিষয়টি জানাই। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে যেতে না পারায় আমাকে চাকরিচ্যুত করেছে তারা। বন্ধ হয়ে গেছে কোম্পানির দোকানটিও। এখন কী করব, কার সাহায্য নেব জানি না কিছুই।’ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বাসিন্দা সেকান্দর আলী যখন এ কথা বলছিলেন, তখন ছলছল করছিল তাঁর চোখ। কয়েক সেকেন্ড পর সেই চোখ
বেয়ে গড়িয়ে পড়ে দুফোটা জল। শুধু সেকান্দরের ফ্লাইট নয়; যুদ্ধের বলি হয়ে গত ৫৫ দিনে শুধু চট্টগ্রাম বিমানবন্দরেই বাতিল হয়েছে ৩৩৮টি ফ্লাইট। এসব ফ্লাইটে যাত্রীও ছিল ১০ হাজারের বেশি।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে বিমান চলাচলের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখন বাতিল করতে হচ্ছে কিছু ফ্লাইট। আগে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি ফ্লাইট বাতিল হলেও এখন হচ্ছে দুই থেকে তিনটি। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৩৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। বাতিল হওয়া এসব ফ্লাইটে ১০ হাজারের বেশি যাত্রী ছিল। শুরুর দিকে যাত্রীদের ভোগান্তির মাত্রা খুব বেশি ছিল। ফ্লাইট বাতিলের বিষয়টি আগাম বলে দেওয়ার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।’
বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল জানান, যাত্রী বিমানবন্দরে চলে আসার পরও নির্ধারিত সময় থেকে বিমান তিন ঘণ্টার বেশি দেরি করলে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসকে নিয়ম অনুযায়ী খাবার দিতে হবে। ১২ ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলে হোটেলে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এই নিয়ম অনেকে মানতে চান না। আমরা সেটি মানতে বাধ্য করেছি অনেক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসকে। তারপরও শুরুর দিকে হাজার হাজার যাত্রীকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
এখন ফ্লাইট বাতিলের তথ্য আগাম জানিয়ে দিচ্ছে এয়ারলাইনসগুলো। সে জন্য ভোগান্তিও কিছুটা কমেছে। কিন্তু চাকরিতে শর্ত যুক্ত থাকায় অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এয়ারলাইনসগুলো তাদের বাতিল হওয়া ফ্লাইটের ৮০ শতাংশ এখনও রিকভার করতে পারেনি বলে জানান তিনি।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে অনেক যাত্রীকে এখন বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। দেশে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এয়ারলাইনসগুলোও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। সূচি এলোমেলো হওয়ায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকেও সেটি মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বিমানবন্দরের জনসংযোগ শাখার তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ৩৩৮টি ফ্লাইটের মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ যাত্রী আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও দোহাগামী ফ্লাইটে ছিল। এর বাইরে ফ্লাইট বাতিল হয়েছে মাসকট, জেদ্দা ও মদিনাগামী বিমানের। গত ৫৫ দিনে সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে বাংলাদেশ বিমান ও এয়ার অ্যারাবিয়ার। এই দুটি সংস্থার বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা দুই শতাধিক। ইউএস-বাংলার ৮০ ও সালাম এয়ারের বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা প্রায় ৫৫টি। ১ এপ্রিল থেকে চট্টগ্রামে প্রতিদিন দুটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে ফ্লাই দুবাই। তাই তাদের বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা অনেক কম।
বড় বিমান দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সেবা দেওয়ায় বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে ৩৫০ থেকে ৪০০ যাত্রী যাতায়াত করতে পারেন। ইউএস-বাংলার বিমানে গড়ে যাত্রী থাকেন ২৫০ থেকে ৩০০ জন। সালাম এয়ার ও এয়ার অ্যারাবিয়ার বিমানে যাত্রী ধারণক্ষমতা ১৫০ থেকে ২০০। এ জন্য বাতিল হওয়া ফ্লাইটে সবচেয়ে বেশি যাত্রী ছিল বাংলাদেশ বিমানের। তার পরে আছে এয়ার অ্যারাবিয়া ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত প্রথম ৩৫ দিনের ব্যবধানে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট ২৪৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়। তখন শাহ আমানত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের অবাধ বিচরণে বেসামরিক বিমান চলাচলের রুটগুলো চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি থাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ সালাম এয়ার, এয়ার অ্যারাবিয়া ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের শারজাহ, দুবাই, আবুধাবি থেকে চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো স্থবিরতা কাটিয়ে অনেকটাই স্থিতিশীল হয়েছে। গত ১৮ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাত দিনে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা একটি অ্যারাইভাল ও দুটি ডিপার্চার ফ্লাইট। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মধ্যপ্রাচ্যগামী একটি ডিপার্চার ফ্লাইট। এয়ার অ্যারাবিয়ার শারজাহ থেকে আসা চারটি অ্যারাইভাল ও চারটি ডিপার্চার ফ্লাইট। সালাম এয়ারের মাসকট থেকে আসা দুটি অ্যারাইভাল ফ্লাইট ও মাসকটগামী দুটি অ্যারাইভাল ফ্লাইটসহ মোট ১৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। তবে একই সময়ে আসা-যাওয়া করেছে অর্ধশতাধিক ফ্লাইট। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, গড়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ২২টি ফ্লাইট চলাচল করে শাহ আমানত বিমানবন্দরে।
- বিষয় :
- ফ্লাইট
