ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পর্যটক এক্সপ্রেস কেন টার্গেট

পর্যটক এক্সপ্রেস কেন টার্গেট
×

কক্সবাজার রুটে এক বছরে বিভিন্ন ট্রেনে ৩৮ বার পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ সময় আক্রান্ত হয়েছে পর্যটক এক্সপ্রেস সমকাল

 তৌফিকুল ইসলাম বাবর

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বন্ধুদের সঙ্গে দিনাজপুরের বিরামপুর থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন হিমেল আহমেদ (২৫) ও আবু সাঈদ (৪০)। গত ২৭ এপ্রিল দুপুরে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেসে’ ট্রেনে করে ফিরছিলেন তারা। ট্রেনটি চকরিয়া এলাকা অতিক্রম করার সময় হঠাৎ বাইরে থেকে ধেয়ে আসে কয়েকটি পাথর। মুহূর্তে হিমেলের মুখ রক্তাক্ত হয়ে যায়। চারটি দাঁত ভেঙে যায়। আরেকটি পাথরে ঘাড়ে জখম হয় সাঈদের। ট্রেনটি চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছানোর পর তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। শুধু হিমেল ও সাঈদ নয়, দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরের আঘাতে প্রায়ই এভাবে আহত হচ্ছেন অনেক যাত্রী। রেলওয়ের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা তৈরিসহ নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করা যাচ্ছে না।

রেলওয়ের তথ্যমতে, ট্রেনে সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে কক্সবাজার রুটে। আর এই রুটে প্রধান টার্গেট পর্যটক এক্সপ্রেস। সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপ করা হয় চকরিয়া ও রামু অংশে। পর্যটক এক্সপ্রেস কেন দুর্বৃত্তদের টার্গেটে পরিণত হলো– তার কারণ জানার চেষ্টা করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

গত এক বছরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলরত ট্রেনগুলোয় অন্তত ১৪৫ বার পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৯ জন। এ ছাড়া ট্রেনের দরজা-জানালাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজার রুটে গত এক বছরে ৩৮টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৪ জন যাত্রী আহত হয়েছেন।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগিগুলোর (কোচ) জানালা খোলার সুযোগ থাকে না। অন্য বগিগুলোর যাত্রীরা বেশির ভাগই বাইরের দৃশ্য দেখতে ও হাওয়া খেতে জানালা খোলা রাখেন। এ সময় হঠাৎ করে বাইরে থেকে ছুটে আসে পাথর।
ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে প্রীতি দাশ নামের এক প্রকৌশলী নিহত  হন। এ ঘটনার পর ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের বিষয়টি বড় দাগে আলোচনায় আসে।
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপকে বাংলাদেশ রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ট্রেনের ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হলে ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। 

কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে। গত মার্চের প্রথম ১৩ দিনে ছয়বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে এই ট্রেনে। এতে কয়েকজন যাত্রী আহত হয়েছেন। গত ১৪ মার্চ রাতে পর্যটক এক্সপ্রেস রামু স্টেশন থেকে ছেড়ে কিছুদূর যাওয়ার পর বাইরে থেকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরে অর্ণন চৌধুরী নামে এক বছর বয়সী এক শিশু আহত হয়। ২ মার্চ রাতে একই ট্রেনটি চকরিয়ার ডুলাহাজারা স্টেশন পার হওয়ার সময় ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে রেলের বেডিং পোর্টার ছাবের আহমদ (৫২) গুরুতর আহত হন। সহকর্মীরা তাকে প্রথমে মালুমঘাট খ্রিষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকরা তার মাথায় ১০টি সেলাই দেন। কক্সবাজার রুটে সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে চকরিয়া ও রামু উপজেলায়। দুর্বৃত্তরা পাথর নিক্ষেপে এই দুই উপজেলার নির্জন স্থানকে বেছে নেয়। অনেক সময় বখাটেদের পাশাপাশি ও  শিশু-কিশোররাও চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারে।
ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে রেলওয়ে। রেললাইনের আশপাশে থাকা স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও স্থানীয় শিশু-কিশোরদের মধ্যে পাথর নিক্ষেপের কুফল তুলে ধরা হচ্ছে। সর্বশেষ গত বুধবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন পরিদর্শনের পাশাপাশি যেসব পয়েন্টে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, সেখানে যাত্রা বিরতি দিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সবুক্তগীন বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে রেলওয়ের পক্ষ থেকে নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে জনসচেতনতা বাড়াতে যেসব স্থানে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে, সেসব স্থানে গণ্যমান্য ব্যক্তি, মসজিদের ইমামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এই ধরনের ঘটনা বন্ধের চেষ্টা চলছে।  পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় যারা জড়িত তাদের শনাক্ত ও আইনানুগ  ব্যবস্থা নেওয়ারও চেষ্টা চলছে।’

আরও পড়ুন

×