বাংলার জয়যাত্রার সঙ্গে হরমুজ অতিক্রম করছে নর্ডিক পোলাক্সও
দুঃসহ ১১৫ দিন পর মুক্ত দুই জাহাজ
হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার পর ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজে থাকা নাবিকদের একাংশের উচ্ছ্বাস সমকাল
সারোয়ার সুমন
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘দুঃসহ এক সময় কেটেছে আমাদের। একদিকে ড্রোন ও মিসাইল হামলার হুমকি। আরেকদিকে কাঁচামাল-শূন্য দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র জ্বালানি পরিশোধনাগার। চাকরিজীবনের সবচেয়ে কঠিন এক সময় পার করেছি ১১৫ দিন। এই সময়ে সেই হরমুজে আটকে ছিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিপিসি) মালিকানাধীন জাহাজ বাংলার জয়যাত্রাও। সেখানে আবার অবস্থান করছিলেন বাংলাদেশি ৩১ জন নাবিকও। শেষ পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া দুটো জাহাজকেই নিরাপদে বের করে আনতে পেরেছি আমরা। এটা এক বিরাট সফলতা’– এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক। এক লাখ টন ক্রুড অয়েল বোঝাই জাহাজ নর্ডিক পোলাক্স পরিবহনের দায়িত্ব আছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠান। হরমুজ প্রণালির রেড জোনে ১১৫ দিন আটকে থাকা তেলবাহী ট্যাংকার ‘নর্ডিক পোলাক্স’ অবশেষে রওনা হয়েছে বাংলাদেশের পথে। জাহাজটিতে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল রয়েছে। এই তেল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডকে (ইআরএল) সরবরাহ করা হবে। সেখানে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর তা সারাদেশে বিতরণ করা হবে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে তেলবাহী এই জাহাজটি এতদিন আটকে ছিল হরমুজে। একই সময় আটকে ছিল বাংলার জয়যাত্রা নামের জাহাজটি। সেটিও হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে নিরাপদে আছে এখন।
ক্রুডবাহী জাহাজটি গত ১ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে তেল বোঝাই করেছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে আটকা পড়ে জাহাজটি। এদিকে ক্রুড তেলের অভাবে গত ১৪ এপ্রিল ইআরএলের কার্যক্রম আংশিক স্থগিত করা হয়। এতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গিয়ে সাময়িক সংকট তৈরি হয়। পরে বিকল্প পথে ক্রুড অয়েল এনে এই রিফাইনারি কোনোভাবে সচল রাখা হয়।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ বন্ধের আলাপ শুরু হওয়ায় বিধিনিষেধ আংশিক শিথিল করেছে ইরান। এর সুযোগ নিয়ে ২৪ জুন জাহাজটি হরমুজ পাড়ি দেয়। আগামী ৬ জুলাই জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) এ চালানটি পরিবহন করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষে।
বিদেশি পতাকাবাহী ট্যাংকারটি এ জন্য ভাড়া করেছে বিপিসি। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘নর্ডিক পোলাক্স ১ মার্চ রাস তানুরায় অপরিশোধিত তেল বোঝাই করেছিল। এরপর থেকে এটি এতদিন আটকে ছিল। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর করপোরেশন বিকল্প পথে তেল আনতে থাকে। বিকল্প রুট হিসেবে আমরা সৌদি আরবের ইয়ানবু ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ থেকে জ্বালানি তেল পরিবহন করছি। এই বিকল্প চালানের কারণে আমরা দেশজুড়ে স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছি।’
মাহমুদুল মালেক আরও বলেন, ‘দীর্ঘ বিলম্বের কারণে বিপুল পরিমাণ ডেমারেজ (বিলম্ব মাশুল) ব্যয় হলেও বিএসসি বা বিপিসি কাউকেই এই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হবে না। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এই ডেমারেজ খরচ বহন করবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ওই রুটে আমরা আর যাব না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার নিয়মিত ব্যবহার করব হরমুজ প্রণালি রুটটি।’
বাংলাদেশ সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের আরামকো ও আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডিএনওসি) থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। সাধারণত সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রাস তানুরা থেকে এবং আরব আমিরাতের তেল জেবেল আলী হয়ে রপ্তানি করা হয়। এই দুটি রুটই হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে গেছে।চলতি বছরের শুরুর দিকে এই কৌশলগত নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে নর্ডিক পোলাক্স আটকে পড়ে। এর ফলে ইআরএল উৎপাদন সংকটে পড়ে। এজন্য সরকার চড়া মূল্যে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি শুরু করে। একইসঙ্গে ক্রুড তেল আমদানির জন্য সৌদি আরবের লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দর ও ওমান উপসাগরে অবস্থিত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর হয়ে বিকল্প রুটে স্থানান্তর করা হয়। এসব বিকল্প রুটের মাধ্যমেই অপরিশোধিত তেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে ইআরএলের কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এক লাখ দুই হাজার ২৮০ টন এরাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল নিয়ে আসা জাহাজ ‘এমটি নিনেমিয়া’ কুতুবদিয়া অ্যাংকরে অবস্থান করছে। জাহাজটি থেকে ক্রুড খালাস চলমান রয়েছে। এটি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে গত ১৭ জুন বাংলাদেশে আসে।এই জাহাজটি তার আগের চালানে এক লাখ টন একই ক্রুড নিয়ে ইয়ানবু থেকে বাংলাদেশে আসে ৬ মে। চালানটি খালাসের পর সৌদি আরব গিয়ে বর্তমান চালানটি নিয়ে আসে।
এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকে ৯৯ হাজার ৭৬৯ টন মারবান ক্রুড নিয়ে গত ২১ মে বাংলাদেশে আসে ‘এমটি ফসিল’। সরকারের সঙ্গে সরকারের (জিটুজি) চুক্তির পদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশ এ ক্রুড আমদানি করে। সৌদি আরব থেকে এরাবিয়ান লাইট ক্রুড এবং আরব আমিরাত থেকে মারবান লাইট ক্রুড আসে। আমদানি করা ক্রুডের শতভাগ পরিবহন করে জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিএসসি। এসব ক্রুড পরিবহনের জন্যই বর্তমানে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান নর্ভিক এনার্জি থেকে জাহাজ ভাড়া নেয় বিএসসি।
- বিষয় :
- জাহাজ
