ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংকটে দুর্গম পাহাড়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি

সংকটে দুর্গম পাহাড়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি
×

নানা সমস্যার মধ্যেও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে কয়লা পশ্চিম সোনাই উচ্চ বিদ্যালয় সমকাল

 বিপুল দাশ, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

মিরসরাই উপজেলার সীমান্তঘেরা করেরহাট ইউনিয়নের দুর্গম কয়লা পশ্চিম সোনাই গ্রাম। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের পাহাড়-নদী ঘেরা এ জনপদে প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক শিক্ষার একমাত্র ভরসা কয়লা পশ্চিম সোনাই উচ্চ বিদ্যালয়। তিন দশকের কাছাকাছি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে এলেও এখনও ভবন, সুপেয় পানি, শৌচাগার, লাইব্রেরি সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় হতাশ দীর্ঘিদন অল্প বেতনে চাকরি করা শিক্ষকরাও। 

সরেজমিন দেখা যায়, টিনের বেড়া দিয়ে নির্মিত ৩০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ মিটার প্রস্থের একটি কাঁচা ঘরে চলছে বিদ্যালয়ের পাঠদান। পাশের ছোট একটি কক্ষ শিক্ষকদের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া নিকটবর্তী একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত দুটি কক্ষেও শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কক্ষসংকটের কারণে একই কক্ষে গাদাগাদি করে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী মো. মহিউদ্দিন, জসিম উদ্দিন ও ফজলুল করিমের উদ্যোগে ৭৫ শতাংশ জমির ওপর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে ছয়জন শিক্ষক ও ২৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৩১০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের মধ্যে শতাধিক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থী রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ১০ জন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২০ সালে স্থাপন অনুমতি, ২০২৩ সালে পাঠদান অনুমতি পাওয়ার পর ২০২৬ সালে স্বীকৃতির লক্ষ্যে সরকারি পরিদর্শনও সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখনও এমপিওভুক্তি হয়নি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পাহাড়ি অনগ্রসর এই অঞ্চলের শিক্ষা উন্নয়নে আমরা নিজেদের উৎসর্গ করেছি। শতভাগ উপযোগিতা থাকার পরও বিদ্যালয়টি এখনও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত। আমাদের নিজস্ব একাডেমিক ভবন নেই, শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা নেই, উন্নত শৌচাগার নেই, সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। প্রায়ই সাপ, কুকুর, বিড়াল ও শেয়াল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়ে। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও এমপিও সুবিধা পেলে এ প্রতিষ্ঠান আরও এগিয়ে যাবে।’
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী দীপু রানী ত্রিপুরা বলে, ‘বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় গাদাগাদি করে ক্লাস করতে হয়। বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি, মেয়েদের কমনরুম, ভালো শৌচাগার কিংবা নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই। তারপরও শিক্ষকদের আন্তরিকতায় আমরা লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছি।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও একজন অভিভাবক আব্দুল আলিম বলেন, ‘এই বিদ্যালয় না থাকলে এলাকার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য অন্তত ১৭ কিলোমিটার দূরের করেরহাটে যেতে হতো। এলাকার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। তাদের পক্ষে দূরে গিয়ে সন্তানদের পড়ানো কঠিন। অথচ এই বিদ্যালয়টি এখনো বিনামূল্যে পাঠ্যবই ছাড়া অন্য কোনো সরকারি সুবিধা পায়নি। পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার স্বার্থে বিদ্যালয়টির উন্নয়ন জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শত শত শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও সরকারি সহায়তার অভাবে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাবনা পূর্ণ বিকাশ ঘটছে না।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফেরদৌস হোসেন বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। বিদ্যালয়ের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার বলেন, ‘বিদ্যালয়টির সমস্যা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এমপিওভুক্তির শর্ত পূরণ হলে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হবে। পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখা এই বিদ্যালয়টির শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা—দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত স্থায়ী ভবন নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, আধুনিক শৌচাগার, লাইব্রেরি এবং এমপিওভুক্তি নিশ্চিত করা হবে। তাদের বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা মিললে প্রত্যন্ত এই জনপদের শিক্ষার্থীরাও দেশের মূলধারার শিক্ষায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

আরও পড়ুন

×