পার্কিংয়ের স্থানে প্যাথলজি, বসেন চিকিৎসকও
নগরীর জিইসি মোড়ের মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালে পার্কিংয়ের স্থানকে বানানো হয়েছে গ্যাস সিলিন্ডারের গোডাউন সমকাল
সারোয়ার সুমন
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা অমান্য করে গ্রাউন্ড ফ্লোরে পার্কিংয়ের পরিবর্তে গ্যাস সিলিন্ডারের গোডাউন বানানো হয়েছে মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালে। সেখানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে রেখেছে তারা ২০০টির অধিক গ্যাস সিলিন্ডার। পার্কিংয়ের স্থানে রিসিপশন, হেল্পডেস্ক, প্যাথলজি, এক্স-রে রুম, ক্যাশ কাউন্টার, মেডিসিনের দোকান ও ডাক্তারের চেম্বার করেছে সিএসসিআর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা করছে রয়েল হাসপাতাল। মেট্রোপলিটন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুই বেজমেন্ট বিশিষ্ট পার্কিংয়ের অনুমোদন নিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে বসিয়েছে কার লিফট।
নগরীর জিইসি থেকে প্রবর্তক মোড় এলাকায় থাকা চার হাসপাতালে সরেজমিন গিয়ে এতসব অনিয়ম পেয়েছে খোদ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। নিয়ম ভেঙে পার্কিংয়ের স্থানে হাসপাতালগুলোর নানা বাণিজ্যিক তৎপরতার কারণে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে লেগে থাকছে যানজট। ঘটছে দুর্ঘটনাও। হাসপাতালের দায়িত্বশীলরা তাদের অপরাধ স্বীকার করে অবৈধ এসব স্থাপনা শিগগির সরাবে বলে অঙ্গীকার করেছে সিডিএর কাছে। সিডিএ বলছে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে এবার বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে তারা।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত ভবনগুলো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কিনা এবং ওইসব ভবনের কারণে সামনের রাস্তায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে কিনা– এ বিষয়গুলো যাচাই করতে সিডিএর ইমারত নির্মাণ কমিটি-১ ও ২-এর সদস্যরা গত ২০ জুলাই নগরীর মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, রয়েল হাসপাতাল, মেডিকেল সেন্টার এবং সিএসসিআর হাসপাতালসহ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চউকের ইমারত নির্মাণ কমিটি-১-এর চেয়ারম্যান ও প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল, ইমারত নির্মাণ কমিটি-২-এর চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ.জি.এম. সেলিম। কমিটির সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমান, অথরাইজড অফিসার-১ কাজী কাদের নেওয়াজ, অথরাইজড অফিসার-২ তানজীব হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। প্রাথমিক এই পরিদর্শনে সব কয়টি হাসপাতালে নকশা লঙ্ঘন ও অপর্যাপ্ত পার্কিংয়ের প্রমাণ মিলেছে।
পরিদর্শনে থাকা চউকের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল বলেন, ‘হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে ভয়াবহ চিত্র পেয়েছি আমরা। চউক কর্তৃক অনুমোদিত নকশায় ভবনগুলোর গ্রাউন্ড ফ্লোরে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে সেখানে রিসিপশন, প্যাথলজি, মেডিসিনের দোকান, ডাক্তার চেম্বার করা হয়েছে। রাখা হয়েছে গ্যাস সিলিন্ডারের মতো বিপজ্জনক সামগ্রীও। বেজমেন্টে পার্কিংয়ের জায়গায় হাসপাতালের ময়লা-আবর্জনাও ফেলা হচ্ছে। কেউ কেউ এটাকে সংরক্ষিত স্থান বানিয়ে ব্যবহার করছে নিজেদের ইচ্ছে মতো। এর ফলে পার্কিংয়ের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। হাসপাতালে আসা রোগীরা গাড়ি রাখার পর্যাপ্ত জায়গা পাচ্ছে না। হাসপাতালের সামনের সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। এতে করে ঘটছে দুর্ঘটনা।’
পরিদর্শক টিমে থাকা সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী ও এলিভেটেডে এক্সপ্রেস প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘অনুমোদিত নকশার বাইরে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করার এখতিয়ার নেই কারোরই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নিজেরা ব্যবস্থা নেবে বলে আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদি তা না করে তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে সিডিএ।’
কোন হাসপাতালে কী পাওয়া গেল
মেডিকেল সেন্টার হাসপাতাল: চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত নকশা অমান্য করে গ্রাউন্ড ফ্লোরে পার্কিংয়ের পরিবর্তে রিসিপশন, প্যাথলজি, মেডিসিনের দোকান, ডাক্তার চেম্বার করেছে মেডিকেল সেন্টার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া বেজমেন্টে হাসপাতালের ময়লা-আবর্জনা ফেলছে তারা। বৃহদাকারের প্রায় ২০০টির অধিক ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্যাস সিলিন্ডারও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে রেখেছে তারা পার্কিংয়ের স্থানে। যে কোনো সময় এসব সিলিন্ডার ঘটাতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

রয়েল হাসপাতাল: বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে রয়েল হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে। হাসপাতালটির গ্রাউন্ড ফ্লোরে পার্কিংয়ের পরিবর্তে ডাক্তারের চেম্বার, দোকান, মেডিকেল ইমার্জেন্সি কক্ষসহ নকশাবহির্ভূত নানা স্থাপনা নির্মাণ করায় পার্কিংয়ের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
মেট্রোপলিটন হাসপাতাল: এই হাসপাতালে দুই বেজমেন্ট বিশিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে কার লিফট পাওয়া গেছে। কিন্তু কার লিফট ডাক্তার ছাড়া রোগীদের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে না। এক সপ্তাহের মধ্যে পার্কিংগুলো রোগীদের জন্য ব্যবহারের সংস্থান রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে তাদের। অন্যথায় হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে সিডিএ।
সিএসসিআর হাসপাতাল: পরিদর্শনের সময় তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদিত নকশা উপস্থাপন করতে পারেনি এই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গ্রাউন্ড ফ্লোরে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে সেখানে রিসিপশন, হেল্পডেস্ক, প্যাথলজি, এক্স-রে রুম, ক্যাশ কাউন্টার, মেডিসিনের দোকান ও ডাক্তারের চেম্বার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের নিয়মনীতিও সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করেছে এ হাসপাতাল। চারপাশে কোনো খালি জায়গা না রেখেই ভবনটি নির্মাণ করেছে তারা। এ ভবনের নির্মিত র্যাম্পটির সামনের মুখ চলে এসেছে মূল রাস্তার ওপরে। সিএসসিআরে পার্কিং এলাকায় কোনো রোগীর গাড়ির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী সিডিএ টিমকে জানায়, পার্কিংটি শুধু চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত গাড়ি রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়। হাসপাতালে আসা রোগীদের জন্য পার্কিং ব্যবহারের কোন সুযোগ রাখা হয়নি। এই হাসপাতালের পার্কিং ব্যবস্থা অত্যন্ত অসন্তোষজনক ও অপ্রতুল বলে মন্তব্য করেছে পরিদর্শক টিম। তারা জানান, এই হাসপাতালে আগত রোগী ও দর্শনার্থীদের যানবাহন বাধ্য হয়ে হাসপাতালের সামনের প্রধান রাস্তায় পার্ক করতে হচ্ছে। এর ফলে রাস্তার প্রস্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রবর্তক মোড় এলাকায় তীব্র যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ এটি।
পরিদর্শক দলের সুপারিশ
১। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে এবং রোগীদের জন্য গাড়ি পার্কিং নিশ্চিত করতে হবে।
২। পার্কিংয়ের স্থানে অবৈধভাবে গ্যাস সিলিন্ডার মজুর রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে। নতুবা যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটে প্রাণহানির মত ঘটনা ঘটতে পারে।
৩। পার্কিংয়ের জায়গায় পার্কিং ব্যতিত অন্য কোন কাঠামো বা স্থাপনা থাকলে তা অপসারণ করে হবে।
৪। জিইসি থেকে প্রবর্তক মোড়, প্রবর্তক মোড় হতে পাঁচলাইশ, পাঁচলাইশ হতে কাতালগঞ্জ পর্যন্ত এলাকায় রাস্তার পাশের হাসপাতালসমূহের পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫। ভবিষ্যতে কোন হাসপাতাল অনুমোদনের পূর্বে ফায়ার সার্ভিস ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অনুমতিক্রমে পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
- বিষয় :
- চিকিৎসক